Showing posts with label Hoichoi. Show all posts
Showing posts with label Hoichoi. Show all posts

Thursday, April 30, 2026

ঠাকুমার ঝুলি: রহস্যের অলিগলি

শ্রাবন্তী এবার গোয়েন্দা চরিত্রে!

ঠাকুমাও বটে!

ঝুলি থেকে তো বেড়াল বেরোয়।


কিন্তু এই ঠাকুমার অন্য ঝুলি..... ঝুলি তো নয়, যেন বুদ্ধির ঝাঁপি!

তবে শুরুটা হয়েছিল বেড়াল দিয়েই।

হয়েছে কি, ঠাকুমা তো বিয়েবাড়ি গেছেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। নাতনীর বন্ধুর বিয়ে। কনে বিলেত ফেরত, নাতনীও তাই! কনে বিষ্ণুপুরের নামকরা চৌধুরীবাড়ির মেয়ে। কিন্তু বিয়েবাড়িতেই কনে খুন!

অবশ্য খুনটা কেউ বোঝেনি! শুধু ঠাকুমা পোস্টমর্টেমটা করতে বলল বলেই তো জানাটা গেল, অবশ্য কনের মায়েরও সায় ছিল! কিন্তু এই করেই তো ঠাকুমা বিপদটা ঘরে ডেকে আনলেন। আরেকটা খুন হলো!

হরি! ঠাকুমার বেড়াল। বেলা আর ফণ্টের মা! পোষ্যদের নাম রাখার ধরনেই স্পষ্ট যে এই ঠাকুমা যে সে ঠাকুমা নন। প্রিয় গায়ক, হ্যারি বেলাফন্তের নাম ভেঙে বিড়ালদের নাম! কে রাখে? গিরিজাবালা দেবী, মানে আমাদের ঠাকুমা রাখেন!

কিন্তু নামের কথা পরে হবে! এবার খুনের কথায় আসি!

ঠাকুমা তো খুন সন্দেহ করলেন বিয়েবাড়ির কাণ্ড দেখে। এদিকে খুনি গেল ঘাবড়ে। সে তখন ঠাকুমার আদরের হরিকে খুন করিয়ে তার মৃতদেহের সাথে একটা হুমকি চিরকুট পাঠাল। কিন্তু এইখানেতেই তার হয়ে গেল মস্ত ভুল।

সম্মুখ সমরে নেমে পড়লেন ঠাকুমা। অবশ্য ঠাকুমাই সম্মুখে, খুনি আড়ালে! কিন্তু ঠাকুমার যা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, খুনি আর কতক্ষণ আড়ালে থাকবে? নিজের শ্বাশুড়ির কাছ থেকে গিরিজাবালা পেয়েছিলেন গোয়েন্দা সার্টিফিকেট, আর তিনি নিজে গোয়েন্দা লেখকের মা, যে ছেলে তার মায়ের আদলেই সৃষ্টি করেছিল তার গোয়েন্দা চরিত্র!

এমন মহিলাকে যে ঠকানো বেশ কঠিন! সাথে আবার অকুতোভয় নাতনী, আর তার সাথে এক ভালোমানুষ সাংবাদিক, উঠতি এবং বেশ অপেশাদার! স্থানীয় পুলিশ অফিসার তো আছেই, তবে ভরসা করার মতো নয় খুনিকে চিনে বের করতে!

এই শেষ চরিত্রটিকে নিয়ে এবার একটা কথা বলে ফেলি বরং এই ময়কায়। এই গোটা রহস্যেঘেরা ধটনাকে হালকা একটা মজার মোড়কে মুড়ে রাখার কৃতিত্বটা যেমন একাধারে সম্রাজ্ঞী বন্দোপাধ্যায়ের কলমের ও অয়ন চক্রবর্তীর পরিচালনার, ঠিক তেমনি যে কয়েকটি অভিনেতা এই মজাটাকে পুরো গল্পটাতে চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জি অভিনীত পুলিশ অফিসারের চরিত্রটি। কৌতুকে মোড়া এই অনবদ্য চরিত্রটিকে যখন দেখছিলাম, তার পরেপরেই শুনতে পেলাম যে এই ভদ্রলোককে আর নতুন কোনো চরিত্রে দেখতে পাবো না। মনটা খারাপ হয়ে গেছিল! রাহুল এই সিরিজটার মুখ্য চরিত্র না হলেও মুখ্য এক ভারসাম্য রক্ষা করে কাহিনীটিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন! এই প্রাণোচ্ছল কৌতুকের মধ্যে দিয়েই তাঁকে মনে রাখব!

কৌতুকের আরেকটি স্তম্ভ হলো দেবরাজ ভট্টাচার্য! তবে শ্রাবন্তীও অসাধারণ। এত বয়স্কার অভিনয় খুব সহজ ছিল না কিন্তু! তাই এই চেষ্টাটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, সাহসী এবং যথেষ্ট পরিণত! চরিত্রটাকে একইসঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন অভিনেত্রী! সাথে অঙ্কিতা মাঝিও সুনিপুণ বিশেষ এক চরিত্রে আর দিব্যাণী মণ্ডলকেও মানিয়ে গিয়েছে ঠাকুমার নাতনি-cum-সহকারী হিসেবে। সহজ ছন্দে চলা এই কাহিনীটি তাই সকলের কাছেই লাগতে পারে বেশ উপভোগ্য!

Saturday, November 29, 2025

নিশির ডাক, করতে পারে হতবাক!

বাঙালীরা রবীন্দ্রনাথকে প্রায় সমস্ত সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গে তো ব্যবহার করেই, দেখাদেখি বাঙলার অনেক অনুষ্ঠানেও তিনি সদা; উপস্থিত। তাই তিনি IPLএও আছেন (courtesy, শাহরুখ খান ও KKR), আবার যেখানে কোনোদিন খেয়ে জাননি, এমন জায়গাতেও উল্লিখিত (courtesy, মহম্মদ নাজমুদ্দিন, সৃজিত মুখার্জি ও OTT)!
কিন্তু এবার বোধহয় এই random রবীন্দ্রনাথ ব্যাপারটা একটু থামানো দরকার, নয়তো কেউ আবেগে ভেসে খুব শিগগির কবিগুরু Multiverse খুলে গুরুদেবকে বিভিন্ন প্রসঙ্গে জুড়ে দেবে।
যদিও এতটা বাড়াবাড়ি এখানে নেই, তাহলেও বলব গুরুদেবকেই দরকার ছিল কি? এই কারণে বলছি যে, চরিত্রটা দরকার কিন্তু রবিঠাকুরকেই নয়! বরং সেই জায়গায় কোনো কাল্পনিক প্রবীণ সঙ্গীতজ্ঞ ব্যক্তি থাকলেই চলত। আসলে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে যে প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে, আমার মতে (আমার অবশ্য রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সাহিত্যজ্ঞান ছোটোবেলায় সহজ পাঠ, 'শিশু'র কিছু কবিতা ও বড়বেলায় গোরা ও কিছু নাটকের মধ্যেই সীমিত), বাস্তবে এরকম কিছু হওয়াটা কবিগুরুর মতো দূরদৃষ্টসম্পন্ন মানুষের দ্বারা মুশকিল বলে মনে হয়েছে।
তাই পরিচালক (জয়দীপ মুখার্জ্জী) ও আর্য রায় (ভাবনা) ভবিষ্যতে এই সুক্ষ্ম দিকটার দিকে খেয়াল রাখলে কাহিনীটা (শ্রীজিব) এই ছোটোখাটো ত্রুটিগুলো এড়াতে পারত।
শুরুতে গল্পটা কিন্তু বেশ এগোচ্ছিল। ছয় বন্ধুর এক দল একটি গ্রামে এসে হাজির হয়। গ্রামের নাম সোনামুখী। গ্রামটিতে আসার উদ্দেশ্য গবেষণার খাতিরে। সঙ্গীত ্নিয়ে ভিন্ন রকমের গবেষণা আর বিষয় হল রবীন্দ্রনাথের পাঁচ প্রিয় গায়িকা। এই গায়িকাদের মধ্যে একজনের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করতেই এই প্রত্যন্ত গ্রামে তাদের আসা। নিশিগন্ধা নামক সেই সুগায়িকার বিবাহ নাকি এই গ্রামেতেই হয়েছিল কিন্তু ্তারপরেই ইতিহাসে তিনি যেন বিস্মৃত। তাই তাঁর জীবনের বাকি অংশটার সন্ধানেই ছয় বন্ধুর এই গ্রামে হাজির হওয়া।
কিন্তু আসার পথেই তারা জানতে পারে সোনামুখীতে নাকি আছে মৃত্যুর ভয়াল হাতছানি। বাইরের লোকজন এই গ্রাম এড়িয়ে চলে খুব স্বাভাবিক কারণে -  কে আর সেধে অকালমৃত্যু চাইবে? তার উপর গ্রামে ঢুকে জানতে পারা যায় আরেক অদ্ভুত কথা। গ্রামেতে কেউ গান গাইলে, তাকে তাড়া করবে মৃত্যু! এক প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মার রোষে সে প্রাণ হারাতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল, বন্ধুদের মধ্যে বেশিরভাগই গ্রামটাতে কিছুদিন কাটাতে চায়। থাকার জায়গা স্থির হয় পুরানো জমিদারবাড়ি, যেখানে নিশিগন্ধার বিয়ে হয়েছিল। বয়সের ভারে জরাজীর্ণ ভগ্নপ্রায় যে বাড়ি দেখলে হয়তো ভূতেরাও ভয় পাবে, এদের কারুর খুব একটা দ্বিধা হয় না সারাদিন ও সারারাত কাটাতে। অবশ্য না হওয়ার একটা কারণ থাকতেও পারে, তারা পৌঁছেছিল রাতে! বোধহয় ঠিক করে বুঝতে পারেনি জায়গাটা। আর সকালে ্কিছু বোঝার আগেই তো ঘটে গেল সাংঘাতিক এক মৃত্যু! একেবারে জমিদারবাড়ির দোরগোড়ায় প্রায়। ব্যস, পুলিশ এসে তাদের জন্য সেখানে থাকাটা, কিছুদিনের জন্য তো বটেই, পাকাপাকি করে দিল!
তারপর যা হয়, দর্শকরা পাবে অশরীরী, রহস্য, মায় জাতিস্মর সম্বলিত এক রোমাঞ্চকর আবহ, আর আমি পেলাম সঙ্গীতের (বিনীত রঞ্জন মৈত্র) অনবদ্য মূর্ছনা, গতিময় সম্পাদনা (সুমিত চৌধুরি), যা পর্বগুলিকে জমাট রেখেছে ও রহস্যে ঘেরা অতিপ্রাকৃত পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চলচ্চিত্রায়ণের (টুবান) মনকাড়া মায়াবী আমেজ।
তাই একবারের জন্য দেখাটা সার্থক হবে, কিন্তু বাকিটা পুরোটাই আপনাদের মত!

Sunday, August 31, 2025

অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ: আইনের আয়নায়!

বিছানায় পড়ে থাকা এক রক্তাক্ত দেহ, এক অভিযুক্ত ড্রাইভার, জনতার দরবার, ময়নাতদন্তে পাওয়া কিছু তথ্য, পুরুষবিদ্বেষী এক দাপুটে মহিলা উকিল নিযুক্ত সরকারপক্ষে বিচারের দাবীতে! ব্যস, আর কি চাই? অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হতে তো আর কোনো বাধাই নেই! জনতা তো রায় দিয়েই দিয়েছে! বিচারেও তাই ধার্য হল। অভিযুক্ত দোষী! অতএব শাস্তি চরম দণ্ড! তাই হুকুম হল ফাঁসির! জনতা ওউকিল, উভয়েই খুশি!

কিন্তু বাদ সাধল এক নাছোড় উকিল। একটা ছোট্ট বিসদৃশতা, আর তার থেকেই নতুন করে প্রমাণ যোগাড় করে বিচারের রায়কে আবার একবার খতিয়ে দেখার আর্জি! তাই আবার শুরু হলো তদন্ত। আবার আদালত বসল বিচার করতে! বেরিয়ে এল কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য! এই সাহসী সিদ্ধান্তের জেরে আর সত্যকে বের করতে অ্যাডভোকেট অচিন্ত্য আইচ শুরু করলো এক অসম লড়াই! সাথে থাকল কয়েকজন শুভাকাঙ্খী আর ফাউ হিসেবে জুটল জনরোষ! ঝামেলা বাড়াতে শুরু হল খুচরো কিছু উৎপাত! তার মধ্যেই চলল অচিন্ত্যর লড়াই! এ যেন হেরে যাওয়ার আগে ফুরিয়ে না যাওয়ার তাগিদ।

রহস্যের মোড়কে ঘেরা এই সিজন বেকার কোনো সময় নষ্ট না করে এক সাবলীল গতিতে এগিয়েছে! কয়েক জায়গায় ভুলত্রুটি চোখে পড়তেই পারে, কিন্তু বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতায় তাকে গুরুত্ব না দিলেও চলবে! যে সমাজে মহিলাদের সন্দেহজনক মৃত্যুর দায় আর্থসামাজিক স্তরের পিছনের দিকের মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়াটা দস্তুর, সেখানে এরকম কিছু ঘটনাকে আমাদের সামনে তুলে আনাটা বোধহয় সময়ে সময়ে দরকার! তার সাথে বোধহয় মানুষের মনের ঘৃণার দিকটাকে প্রয়োজন চিনিয়ে দেওয়ার, কারণ মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়ানক প্রবৃত্তি বোধহয় এই রিপুটি যা যুক্তিবুদ্ধির তোয়াক্কা না করে মুহুর্তের মধ্যে দোষীকে ভুলে নিরপরাধকে দোষী বানিয়ে ফেলতে পারে! দর্শকদের চোখটা এভাবে কল্পনার জগতে খুলে দিতে পারলে বাস্তবেও হয়তো একদিন আশপাশের অমানবিকতার বিরুদ্ধে তারা নতুন আঙ্গিকে প্রশ্ন করতে পারবে!

এরকম সিজনের জন্য তাই হইচইকে ধন্যবাদ,

মনকাড়া অভিনয়ের জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য দেবরাজ ভট্টাচার্য, সত্যম ভট্টাচার্য, সোহিনী সেনগুপ্তর,

ধন্যবাদ সামগ্রিকভাবে পরিচালক জয়দীপ মুখার্জ্জীকে ও এই সিজনের বাকি সকল কলাকুশলীকে!

Sunday, March 31, 2024

Robinson Street Horror Story Myth vs Reality: সত্য বনাম সিদ্ধান্ত!

ছয় পর্বের তথ্যচিত্রটির মোট দৈর্ঘ্যের তুলনায় কম তথ্য, প্রচুর বক্তব্য, একই ঘটনা, ছবি ও দৃশ্যের বারংবার পুনরাবৃত্তি এবং সিদ্ধান্ত পেশ করার বিরক্তিকর তাগিদ - বলা যায় এটাই যেন তথ্যচিত্রটির ভাবনার মূল সারাংশ! কিন্তু এমন তো হওয়ার ছিল না! কলকাতার রবিনসন স্ট্রিটে উন্মোচিত হওয়া চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে তথ্যচিত্র তো হবে কৌতুহলোদ্দীপক!
কিন্তু কই, সেরকম কিছু কি আদৌ হলো? মনে তো হলো না!
বাকিটা বলার আগে বরং আরেকবার ফিরে যাই অতীতে, ২০১৫ সালের জটিল সেই সকালে! যেদিন হঠাৎ রবিনসন স্ট্রিটের অরবিন্দ দের বাসভবন থেকে উদ্ধার হলো বাড়ির মালিকের অগ্নিদগ্ধ দেহ। বাড়ির শৌচালয় থেকে দেহ উদ্ধারের পর পুলিশের কাছে জেরা চলাকালীন অরবিন্দবাবুর ছেলে, পার্থ দে-র কথায় উঠে আসে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য - পার্থবাবুর দিদি আর তাঁদের পোষা দুই কুকুর নাকি তাঁর ঘরেই আছে! কথামতো আরেক দফা তল্লাশি চালিয়ে পুলিশের কাছে উদ্ঘাটিত হয় আরেক ভয়ানক সত্যের - পার্থবাবু মাসছয়েক নিজের ঘরের বিছানায় একটি মানুষের কঙ্কাল ও সেই ঘরেতেই দুটি জন্তুর কঙ্কালের সাথে বাস করছেন আর তাঁর কথামতো সেগুলি তাঁর দিদি ও বাড়ির দুই পোষ্যের! ব্যস, এবার শুরু হলো তোলপাড়। লোকেদের মুখে, কাগজের পাতায়, তখন শুধু একটাই খবর - পার্থ দে! যেটুকু তথ্য পাওয়া যেতে লাগল, তার উপর ভিত্তি করে মিডিয়াতেও তালে তাল মিলিয়ে চললো চুলচেরা বিশ্লেষণ, এবং, অবশ্যই, পার্থবাবুর বিচার!
তবে গুজব বাদ দিয়ে যে প্রশ্নগুলো ওঠা প্রয়োজন ছিল, এবং, উঠেছিল, তা হল,
কঙ্কালগুলো কাদের?
একটা মানুষ কি করে মৃত ব্যক্তির কঙ্কালের সাথে প্রায় মাসছয়েক একই ঘরে কাটাতে পারে, ভাবা দরকার যে কেউ যদি জানতে না পারত, আরো কতোদিন কেটে যেত এভাবে?
মানুষ আর কুকুরগুলোর মৃত্যু হলো, মৃতদেহগুলো কঙ্কালে পরিণত হলো, কিন্তু কোনোরকম গন্ধ বেরোল না কি করে?
অরবিন্দবাবুর আত্মহত্যার কারণ কি?
এই পরিস্থিতিতে বাজার দোকান করা ও বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ কি করে বজায় রাখা হতো?
এরকম হাজারো প্রশ্ন লোকের মনে হয়েছিল। আমারও হয়েছিল। কিন্তু তখন কেন জানিনা আমি নিজে খবরটা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে নাড়াচাড়া করিনি। মনের মধ্যে পার্থবাবুর নামটা ও কঙ্কালকাণ্ডের স্মৃতি আবছা করে শুধু কিছুটা রয়ে গেছিল।
তাই এবার যখন শুনলাম যে ঘটনাটা নিয়ে একটা তথ্যচিত্র হবে, খুব আগ্রহের সাথে দেখতে বসলাম এই ভেবে যে পুরো ঘটনাটা এবার বোধহয় বুঝতে পারব।
কিন্তু কোথায় কি? মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকারকে প্রধান করে যে তথ্যচিত্র দেখলাম, সেটাতে পার্থবাবুর মনটাকে হয়তো চিনলাম কিন্তু ঘটনাটা যেন যেই তিমির সেই তিমিরেই রইল। এমনকি, এত বেশি সিদ্ধান্ত শুনলাম যে মনে হলো কিছুটা যেন আগে থেকেই ভেবে রাখা হয়েছিল কোন দিকটাকটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। কমলেশ্বর মুখার্জ্জী খানিকটা যেন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে ফেললেন মূল বিষয় হিসেবে। কিন্তু তাহলে তো সিরিজটির নামকরণে গলদ থেকে যায়। মানতাম, যদি শুধুমাত্র পার্থ দে-কে অবলম্বন করে তথ্যচিত্র বানানো হতো। কিন্তু এখানে তো ঘটনাটা কেন্দ্রীয়, বাকিটা গৌন না হলেও মূখ্য তো বলতে পারি না! হতে পারে যে আমার চিন্তাটা ভুল, তবে কঙ্কালগুলো কি করে প্রমাণ হলো কাদের, অরবিন্দবাবুর মৃত্যু আর মৃতদেহ থেকে ঘরের মধ্যে কঙ্কালে রুপান্তর হওয়াটার বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা কেন হলো না? যেখানে স্বীকার করা হয়েছে দেশে মনোরোগ চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নবীন - আনুমানিক ৭০ বছরের খানিকটা বেশি হবে - সেখানে প্রবীণ কিছু বৈজ্ঞানিক উপায় যেমন রসায়ন ও জীববিজ্ঞান, যেগুলো দিয়ে এই সমস্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া যেত, সেগুলিকে এরকম সরিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল কি? মানসিক অবস্থা নিয়ে আলোচনার মাঝে অনাবশ্যক কবিতাই বা কেন পাঠ করার দরকার হলো কমলেশ্বর মুখার্জ্জীর গলায়?
অল্প তথ্য ও অনেকটা ধারনা দিয়ে তৈরি এই তথ্যচিত্র মনে হলো কোভিডের সময়ে নির্মিত। পার্থবাবুর মানসিক দিকটাকে নিঃসন্দেহে অনেকটাই তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু তবু অনেক কিছুই রয়ে গেল অন্ধকারে। তথ্যের অপ্রতুলতা ছাড়াও তথ্যের একপেশে ভাব ব্যাপারটাকে অনেকটাই ক্লান্তিকর করে দিল! তবে পাওনা একটাই - নির্মিত চরিত্রকে শুধু মুকাভিনয় দ্বারা বিভিন্ন মানসিক রূপের বহিঃপ্রকাশ সমেত নিপুণভাবে মেলে ধরা লোকনাথ দে ও অময় দেবরায়ের পেশাদার অভিনয়ের যুগলবন্দী।

Friday, September 22, 2023

কলকাতার রহস্যের মাঝে মিঃ কলকেতা

ভেবেছিলাম দারুন কিছু একটা ব্যাপার হবে নিশ্চয়। কলকাতার অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা রহস্যের হাতছানি থাকবে। ঋত্বিক আছে তো, ঠিক জমিয়ে দেবে! কিন্তু কোথায় কি! জমলো না তো পুরোটা! গল্পটা (সৌগত বাসু) দারুন, যেন কলকাতার ন্যাশনাল ট্রেজার, সম্পাদনা (রবিরঞ্জন মৈত্র) ঝরঝরে ও মজাদার সুরেতে ভরা গান, ধ্বনির পরিপাটি মিশ্রণে (শুভদীপ গুহ, আনিস আহমেদ, অভি, সৃজন দেব) পরিবেশিত রহস্যের আবহ!
কিন্তু ওই যে, ন্যাশনাল ট্রেজার ভাবলাম বলেই বোধহয় গোলমালটা পাকালাম। কলকাতার কোন নির্দিষ্ট গুপ্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখা মসলিনের সন্ধান পাওয়াটা তো চাট্টিখানি কথা নয়! ইতিহাসটা ঠিক করে বোঝানো দরকার। কাহিনীটা এইখানেই কিরকম খাপছাড়া হয়ে গেছে! রহস্যটা রোমাঞ্চ জাগাতে পারে নি। তার উপর তুখোড় তিনজন অভিনেতা (ঋত্বিক চক্রবর্তী, দেবেশ রায়চৌধুরী, কৌশিক সেন) থাকা সত্ত্বেও তাদের ঠিক করে ব্যবহার করা হয়নি আমার মতে। গতিটাও কিন্তু বেশ অগোছালো লাগলো। রহস্যের মধ্যে আটকে গিয়ে পরিচালক (সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়) নিজেই যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন মাঝপথে। রহস্যটা সাধারন হলেও শুধুমাত্র সপরিবারে দেখার মতো করে বানানোর জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ জানাই। অনুরোধ একটাই সিরিজটা সম্বন্ধে, আবার ফিরে আসার যে ইঙ্গিতটা পেলাম এবার, এই সিজনের খামতিগুলো যদি ভবিষ্যতে শুধরে নেওয়া যায়, বিষয়বস্তু অনুযায়ী, এই সিরিজ, আমার মতে, ক্রমান্বয়ে দর্শক সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে!

Thursday, September 7, 2023

কুমুদিনী ভবন, হোচি সরকার ও অনেকগুলি রহস্য

কুমুদিনী ভবনে রহস্য দেখা দিয়েছে। মানে কুমুদিনী ভবন নামক মহিলাদের মেসটিতে ভীষণ সব কাণ্ড ঘটছে। বাড়িটিতে নানা বয়সের ও বিভিন্ন পরিচয়ের মহিলাদের ভাড়া দিয়ে থাকেন বাড়ির কর্ত্রী, মাসিমা। সাথে বাড়ির পরিচারিকা ও নিজের অনাথ ও অসুস্থ নাতি! মোটামুটি নিজের বাড়ির মতো ঘরোয়া করে থাকার পরিবেশ। দিনগুলো সবাই মিলে হইচই করেই কাটিয়ে দিতো। আপাত ঝামেলাহীন বাড়িটিকে কেন্দ্র করে পরপর তিনটে খুনই তাই পরিস্থিতিটা ঘোরালো করে দিলো! একসাথে তিনটে খুন - আবার ঠিক খুনের দিনটাতেই আগমন হয় এক অচেনা মহিলার - অফিসার হোচি সরকার তো চাপে পড়বেই! একে তো তিনটে খুনের জট, তার উপর তিনি আবার মৃতদেহ সহ্য করতে পারেন না, কি যে করবেন কে জানে?
অবশ্য পুরোটা যদি জানতেই হয় তবে তো দেখতেই হবে বাকি ব্যাপারগুলো। অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও উষসী রায়ের অভিনীত সিরিজটি শুধু অভিনয়ের খাতিরেই খুব উপভোগ্য। রহস্যটা জমাটও থেকেছে অর্কদীপ মল্লিকা নাথের গতিময় পরিচালনার জাদুতে। হাসিঠাট্টার মোড়কে রহস্যের উপস্থাপনা করে গোয়েন্দা কাহিনীটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।

Wednesday, July 12, 2023

গোরা 2: জমে গেল too!

গোরাতে কিন্তু no গোলমাল! মানে গলদ আছে, তবে তা নিয়ে চাপ না নিলেই তো হোলো! এই বাজারে এমন পুরোদস্তুর অদ্ভুত কিন্তু প্রায় পুরোপুরি জমাটি সিরিজ তো বেশি দেখতে পাওয়া যায় না কোথাও! এক বিদঘুটে রকমের ভুলো ব্যক্তি, যে পারলে নিজের নামটাও ভুলে যায়, সে কিনা serial killer ধরার specialist? তার উপর আবার সাংঘাতিক বদমেজাজ। তার উপর আছে গানের বাতিক। যদিও সেই গানের তেজ stengun মনে পড়িয়ে দেবে! কিন্তু কি আর করবেন বলুন, লোকটা তো এইসবের মধ্যেও গুছিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে! তাই এই চমকে দেওয়া private defective মানুষটাকে দেখা must! লোকটা আপনাকে ঠিক টেনে আনবে অদ্ভুত কিছু রহস্যের মাঝে। শুরুতে মাথাটা বেশ করে গুলিয়ে দিলেও রহস্যের জট অবশেষে ঠিক যুক্তি দেখিয়ে খুলে দেবে।
গোলমাল অবশ্য এবার শুধুমাত্র এক রহস্যেতেই সীমাবদ্ধ নেই। গুরুতর আরেক গোলমাল গোরা নিজেই এবার বাধিয়েছে। তড়িঘড়ি গোরা চেয়েছে বিয়ে করে ফেলতে! তো পাত্রীও যে হাতের কাছে নেই তা নয়! কাছাকাছির মধ্যেই তো একজন আছে। গোরার বাড়িতে তার মায়ের চোখের ছানি কাটানোর পর রাতদিন থেকে যাওয়া আয়াটি তো সম্ভাব্য পাত্রীদের মধ্যে অন্যতমা! একহাতে গোরার মাকে সেবাযত্ন করতে করতে যে গোরাকেও টাইট দিতে পারে, তাকে কি করে গোরার থেকে কোনো অংশে কম বলব?
আবার গোরার যে নতুন মক্কেলটি, তাকেও প্রার্থী হিসেবে ভাবাই যায়! তো গোরা কি করবে? বিয়ে না রহস্যভেদ! তবে গোরা যা খুশি করুক, আপনি কিন্তু দেখে ফেলুন এমন তালে তাল মেলানো সাবলীল অভিনয়ের এক অসামান্য সিরিজ। সত্যি বলছি, সিরিজটা দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, কাহিনী, প্লট, এসবের কি দরকার, যেখানে অভিনয়টাই আসল! কি ঋত্বিক চক্রবর্তী, কি সুহোত্র মুখোপাধ্যায়, কাকে ছেড়ে যে কাকে দেখব! অনবদ্য এই দুজনের তালে তাল মিলিয়ে আছে মানালি মনীষা দে, মৃদু অথচ দরকারমতো হালকা রসিকতা সরবরাহ করতে দক্ষ অভিজিত গুহ, চাপা কান্নার সাথে মাপমতো হাসি নিয়ে উষসী রায়ের ছোটো কিন্তু মজার মাঝেও লক্ষে অবিচল থাকা অনমনীয় চরিত্র।
তবে সিরিজটা দেখে যে এত আনন্দ পেলাম তার মূল কারণ বোধহয় আরো গভীরে। রহস্যের মোদ্দা ব্যাপারটা বালকসুলভ হলেও ও পরের দিকে গতি খানিকটা থমকালেও, সাহানা দত্তের মুচমুচে স্ক্রিপ্ট ও রবিরঞ্জন মৈত্রের ঝোড়ো সম্পাদনা মাতিয়ে দিয়েছে। জয়দীপ মুখার্জ্জীর পরিচালিত সিরিজটিতে তাই রহস্যের চাপটা না নিয়ে উপভোগ করতে পারলে প্রাণবন্ত অভিনয় দেখার সহজাত রেশটা মনকে খানিকক্ষণের জন্য হলেও চাপমুক্ত করে রাখবে।

Sunday, July 2, 2023

Homestay Murders: খুনির সাথে, খুনের মাঝে, একই বাড়িতে

গল্পটা কিন্তু মন্দ না! খুন আছে, রহস্য আছে, চুরিও আছে, আর গোয়েন্দা তো আছেই! তবে মুশকিলটা হলো অন্য জায়গায়। গল্পটাতে দেখানো হয়েছে কোনো এক পাহাড়ী নির্জন পরিবেশে এক পান্থশালায় খুন হয়। জনবসতি থেকে অনেকটা উপরে অবস্থিত জায়গাটায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে জনসংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তো খুন এরকম জায়গায় হলে, স্বাভাবিকভাবেই পান্থশালার লোকজনেরা নিজেদের মধ্যেই কাউকে খুনি সন্দেহ করবে! তৈরি হবে অবিশ্বাস, আশঙ্কা ও ভয়ের বাতাবরণ! গোয়েন্দা ও আততায়ীর মুখোশ পড়া চেহারাগুলোর আড়ালে শুরু হবে লুকিয়ে না থাকা মানুষগুলোর মধ্যে এক রুদ্ধশ্বাস লুকোচুরি খেলা জেতার পরীক্ষা। তার সাথে তো আছেই অতীত ও বর্তমানের ধূসর অধ্যায়ের আরো কিছু ইঙ্গিতবাহী ঘটনার চমক। তো এতটা দেখে আমার মাউসট্র্যাপ নাটকটা মনে পড়াটাই বোধহয় উচিত! মিল তো একটা অবশ্যই আছে! কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয়। বিশ্বের বিখ্যাত কোনো গল্প অবলম্বন করাই যায়। অনেক পরিচালক নিজেদের মতো করে বিভিন্ন সময় ও স্থানোপযোগী করে কাহিনীর রুপান্তর করেছেন। ভবিষ্যতেও এমনটা হওয়া খুব স্বাভাবিক! ব্যাপারটা প্লটের সর্বকালের সেরাদের মধ্যে থাকার লক্ষণ! তাই তা নিয়ে কোনো নালিশ নেই কারুর কাছে। কিন্তু, তা বলে গতিটা হবে এত নিস্তেজ? এত সাদামাটা করে প্লটের বুনন হবে? আটকে থাকা নিরুপায় নির্দোষ মানুষগুলোর দমবন্ধ অবস্থাটা কোনোভাবেই ফুটে উঠবে না সম্যকভাবে? এত সরলীকিকরণ করতে হবে জায়গায় জায়গায় কোনোরকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই? গল্পের মধ্যে এত অসম্পূর্ণতা থাকে কি করে? সময়ের হিসেব তো গোঁজামিলে ভরপুর মনে হল! অর্জুন চক্রবর্তী অভিনয়টা ঠিক রাখার অনেক চেষ্টা করলেও, বাকিদের চালচলন কিরকম যেন দায়সারা গোছের! সোহিনী সরকার তো দাঁত দিয়ে ক্রমাগত নখ খেয়ে কিরকম ঘুমের ঘোরে যেন চিবিয়ে চিবিয়ে সংলাপ আওড়ে চললেন। বোধহয় সাজানোটা খুব পরিপাটি করার দিকেই শুধু মন দেওয়ায়, মানে সায়ন্তন ঘোষালের হাতে পরিচালনা থাকলে যে ছিমছাম উপহারটা পাওনা হয়, দরকারী জটিলতাগুলো কিন্তু পরিচালক এড়িয়ে গিয়ে গোলমাল করে ফেলেছেন জায়গায় জায়গায়।
তবে একটা ব্যাপারে কিন্তু এই সিরিজটা দেখা, থুড়ি, শোনাটা সার্থক। সিরিজটার অসামান্য সুর, ধ্বনি ও তাদের সংযোগ মন ভরিয়ে দেবে। শিবাশীষ ব্যানার্জ্জীর ওপেনিং স্কোর থেকে অয়ন ভটচাজের দুরন্ত মিক্সিং, সাথে সায়ন বাইরি, তারপর সম্রাট রায় একটা পর্বে এবং সৌরভ বোসের সম্পাদনার সুরের বিভাগে কোনো গলদ নেই। তাই আমার খারাপ নেটওয়ার্কে সিরিজটা আরো অসহ্য দেখতে লাগলেও, শুনতে আদৌ মন্দ লাগেনি তার সুরের জোরালো ঝংকার!

Monday, June 26, 2023

এটা কি রাজনীতি হল?

রাজনীতি দেখলাম।

শুরুতেই এক মহিলার গাড়ি অ্যাক্সিডেণ্টে আপাদমস্তক ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় হাসপাতালে শয্যা। প্রাণে বাঁচলেও স্মৃতি তার সাময়িকভাবে লোপ পায়। তবে পুরোপুরি লোপ পায় বলাটা ঠিক নয় - মাঝে মধ্যে মোবাইলের মিসড কলের মতো জানান দিয়ে যায় তার উপস্থিতি। তো সেই প্রায় বিস্মৃত ঘটনার কিছু কিছু ঝলক মনে পড়িয়ে দেয় মহিলাকে যে যেদিন দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তখন ড্রাইভারের জায়গায় আরেকজন বসেছিল। কিন্তু চেনা পরিচিতদের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা হলে তারা বলেই চলে যে গাড়িতে সাথে শুধু ড্রাইভার ছিল। ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক ঠেকে মেয়েটির কাছে। তার উপর তার মোবাইলে কোথাকার কোন জালি অনির্বাণের মেসেজ আসতেই থাকে যা তার সন্দেহকে আরো জোরদার করে। এরপর সত্যটাকে বার করতে চলে গুছিয়ে প্রয়াস।

তো এই পর্যন্ত পড়ে যদি পরীক্ষার প্রশ্ন আসে সিরিজটির নামকরণের যথার্থতা নিয়ে, তখন এর মধ্যে যে রাজনীতি কোথায় ঢুকল, সেটা বোঝাই দায় হবে। মানলাম, নায়িকার পিতা রাজনীতিক, গোটা পরিবার, অধিকাংশ পরিচিতজন রাজনীতির সমুদ্রে স্নান করে, কিন্তু যেখানে ঘটনাটা আসলে একটি রহস্যের, সেখানে অকারণ জলঘোলা করাটা কি আদৌ দরকার? কাহিনীতে জোর করে রাজনীতির বান ডাকিয়ে একটা ঠিকঠাক রহস্য গল্পকে কিরকম বেকার করে দিলো।

অবশ্য পুরোটা দেখে সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে রাবণ কার খুড়তুতো বোন জাতীয় প্রশ্ন উঠবে না কারণ সাত পর্বের সপ্তম পর্বে রাজনীতির পঙ্কিল রূপটা অবশেষে প্রকাশ পাবে, কিন্তু তবুও বলবো কাহিনীটি আদপে রহস্যের, তাকে কোনোভাবেই পলিটিকাল ড্রামা বলাটা ঠিক নয়। পরের সিজনে যদি রাজনীতিকে মুখ্য করে দেখানো হয়, তখন না হয় বলব বুঝলে। ততদিন পর্যন্ত, বলতে বাধ্য হচ্ছি, নামকরণ অসার্থক।

অভিনয় প্রসঙ্গে প্রথমেই বলি কৌশিক গাঙ্গুলির কথা। ভদ্রলোক পরিচালনা নিয়ে ছিলেন, বেশ ছিলেন, অভিনয়ের দিকটা অন্যদের উপর ছাড়লেই ঠিক করতেন বোধহয়। অপরদিকে দিতিপ্রিয়া রায় ও অর্জুন চক্রবর্তী প্রচুর চেষ্টা করেছেন কিছু করার, প্রথমজন তো বটেই, কিন্তু রহস্য ও রাজনীতির গোলমালে পুরোটাই যেন গুলিয়ে চমকগুলোকে মৃদু করে দিয়েছে। মধ্যিখান থেকে কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় মানানসই চরিত্র পেয়ে চমৎকার ছাপ রেখে দিলেন পরিমিত অভিনয়ের।

জমজমাট প্লটের প্রচুর উপকরণ ছিল, শুধু লক্ষ্যটা স্থির না হওয়াতে রান্নাটা মনের মতো হলো না। তাই সৌরভ মুখোপাধ্যায়কে অনুরোধ করব, পরের সিজন থেকে নামটা যদি খেয়াল রেখে পরিচালনা করা হয়, তাহলে খুশি হবো।

Friday, May 5, 2023

জাতিস্মর পরিচয়

ব্যাপক একটা সিরিজ দেখলাম হইচইতে।

জাতিস্মর!

তুখোড় প্লট, রহস্য ও নাটকীয়তায় মোড়া চূড়ান্ত চমক, অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফি, গা ছমছমে সুর আর সঙ্গতিপূর্ণ পরিচালনবোধের মিশেলে উপভোগ্য সাতটি পর্ব।

বাংলায় টানটান উত্তেজনাপূর্ণ রহস্যের এরকম সিরিজ বহুদিন পর দেখলাম।

জমাটি রহস্যে ঘেরা পরিবেশের সূত্রপাত শহর থেকে খানিক দূরে এক গ্রামের ব্যবসায়ী পরিবারের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় একটি মেয়ের আচমকা আবির্ভাবে। শহর থেকে গ্রামেতে ফটো তুলতে আসা মেয়েটি হঠাৎ করে যেন অজ্ঞান হয়ে যায় প্রাসাদটির সামনে। তারপর আপাতদৃষ্টিতে তাকে যখন সুস্থ মনে করা হয়, সে শুরু করে এক অদ্ভুত আচরন, যেন বাড়িটি তার কতদিনের চেনা! দিনটাও ছিল অদ্ভুত! গ্রামের মন্দিরের দেবী বছরের সেইদিনই নাকি শুধুমাত্র পূজা গ্রহণ করেন ও বাকি দিনগুলো মন্দির বন্ধ থাকে। প্রচলিত আছে যে, সেদিন নাকি গ্রামের কোনো মৃত ব্যক্তির আত্মা ফিরে আসবে! তাই এই বিশেষ দিনটিতে শুরু হওয়া মেয়েটির আচরণ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, আর তার সাথে যেন পাওয়া যায় পুরনো কোন ভয়াবহ ঘটনার ইঙ্গিত!

বাকিটা সানি ঘোষ রায়ের পরিচালনায় অনুজা চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনীর চমকে উপভোগ করা যাবে। সাথে ইন্দ্রনীল মুখার্জ্জীর অসাধারন সিনেমাটোগ্রাফি, আনিস আহমেদ ও দেবায়ন ব্যানার্জ্জীর ভয় জাগানো সুরের আবহ, তীর্থঙ্কর মজুমদারের গা শিরশিরানি ধ্বনি প্রক্ষেপণ, ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করতে আর কি চাই? অবশ্য আর যা চাই, সেটা কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজির ত্রুটিহীন অভিব্যক্তি ও মধুমিতা সরকারের অভিনয়ের অভিনবতা মিটিয়ে দিয়েছে! পাশাপাশি, রোহন ভট্টাচার্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিনয় করেছেন বাকি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের মধ্যে।

Thursday, April 13, 2023

ব্যোমকেশ: বন্দিনিবাসে

কিছু গল্প বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। কিছু সিনেমা বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। আবার কিছু গল্পের চিত্রায়িত রূপ যতবার যতভাবে দেখায়, বারবার দেখার জন্য মনটা মুখিয়ে থাকে। কিছু চরিত্রের ক্ষেত্রেও কথাটার অন্যথা হয় না। 'ব্যোমকেশ' চরিত্রটা আর 'চিড়িয়াখানা' কাহিনীটা সেই প্রকারের।

আমি কাহিনীটা পড়েছি, সত্যজিতের 'চিড়িয়াখানা' সিনেমা ও অঞ্জন দত্তের 'ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা' সিনেমা সিডিতে দেখেছি, বাসু চ্যাটার্জ্জীর 'চিড়িয়াঘর' সিরিয়াল টিভিতে দেখেছি। কাহিনীটা জানি, কে খুন হবে জানি, কে খুন করবে জানি, ব্যোমকেশ কোথায় ভুল করবে জানি, খুনী কখন ধরা পড়বে জানি, মোটিভ জানি, চরিত্রদের ধরন জানি, কিন্তু কিছুতেই পুরনো যেন হয় না রহস্যের এই অধ্যায়গুলো। তার উপর যদি পরিচালক হয় নতুন, মানে নতুন করে আবার পুরনো স্বাদ পাওয়ার যদি কোনো সুযোগ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই! দেখতেই হবে!

তাই সুদীপ্ত রায়ের পরিচালনায় ব্যোমকেশের অষ্টম সিজন হইচই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখে ফেললাম। নামটা পিঁজরাপোল করা হয়েছে, প্রথম পর্বে ব্যোমকেশের উপস্থিতি নেই প্রায়, গলাটা শুধু শুনতে পাওয়া গেছে শেষ বেলায় প্রায় - দেখেশুনে খুব বিরক্ত লাগছিল। ভাবছিলাম এ আবার কি ধরণের আঁতলামি! কিন্তু গোয়েন্দা গল্পের আকর্ষণটা ছাড়তেও পারছিলাম না। পুরোটা দেখতে তো হবেই।

ভাগ্যিস! বাকিটা, যাকে বলে, জাস্ট ফাটাফাটি! গল্পটার মূল ভাবটা অপরিবর্তিত রেখে কিছু বদল করা হয়েছে। কিন্তু বদলগুলো মোটামুটি যুক্তিপূর্ণ। ব্যোমকেশরূপী অনির্বাণ ভটচাজ অসাধারন, বিজয়ের ভূমিকায় সৌমিক মৈত্রও নজর কাড়বে। রিদ্ধিমাও সাবলীলভাবে স্বাভাবিক সত্যবতীর চরিত্রে। ভাস্বর চ্যাটার্জ্জী এবার অজিত - নতুন মুখ, নতুন অভিব্যক্তি!

তবে যেটা আরেকটি চমক, সেটার আঁচ নাম দেখানোর সময় খেয়াল করলেই পাওয়া যাবে। অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবার শুধু ব্যোমকেশ হিসেবে নয়, আর্ট ডিরেক্টর হিসেবেও বিদ্যমান। প্রমাণ প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শটের নির্বাচনে! দৃশ্যের মধ্যে দিয়েই গল্পটা পরিবেশন হয়েছে পরিমিত সংলাপের সাথে - এটাই তো শিল্প, এটাই তো আমার মতে সঠিক চলচ্চিত্রায়ণ! সাথে আছে শুভদীপ গুহর অসামান্য ওপেনিং স্কোর, যা 'এলিমেণ্টারি' ও 'শার্লক'-কে মনে করাতে পারে।

অনন্যসাধারন হতে পারত সিরিজটা। কিন্তু মনের মধ্যে অস্বস্তি যে রয়েই যাচ্ছে। নাম পাল্টে কাহিনী আত্মপ্রকাশ করলো, প্রসঙ্গ অনুযায়ী মানলাম (মানেটা অভিধান থেকে দেখতে হয়েছে)। গোয়েন্দা দেরিতে দৃশ্যে প্রবেশ করছে, সেটাও মানলাম। আরো অনেক কিছু মানলাম। কিন্তু তা বলে ব্যোমকেশের পেট খারাপের অসুবিধা গোটা পর্বগুলো জুড়ে দেখাতে হবে। একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না কি। ব্যোমকেশ মধ্যবিত্ত বাঙালী গোয়েন্দা। সেটা আমরা জানি। তার পেটখারাপ হলেও তাই, না হলেও তাই। সেটাকে এরকম পেটখারাপের মধ্যে দিয়ে দেখানোর দরকারটা ঠিক হজম হলো না, অবশ্য যদি এই প্রসঙ্গটাকে অনির্বাণের অভিনয়বোধের অসামান্যতা বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে আলাদা কথা! কিন্তু তাহলে যে ব্যপারটা অপ্রাসঙ্গিক! তাই ব্যোমকেশকে শৈল্পিক আঙ্গিকে দেখালেই চলবে, তার ব্যক্তিত্বকে অস্বাভাবিক অপ্রাসঙ্গিকতার প্রলেপ দেওয়াটা অনাবশ্যক।

Sunday, January 29, 2023

করবে কাবু একেনবাবু!

একেনবাবু কলকাতায় এলেন.... অপরাধ দেখলেন..... সমস্যার সাথে সাথে দর্শকদের মনও প্রায় জয় করে ফেলেছিলেন, কিন্তু বাদ সাধল শেষটুকু! অবশ্য এরকম কর বলাটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না, অভিযোগটা হতেই পারে একান্তই আমার ব্যক্তিগত মত। তাই আগে বরং বলে নেওয়া যাক মনকাড়া প্রসঙ্গগুলোর সম্বন্ধে।

প্রথমেই প্রশংসা করতে হয় গল্পগুলোকে সমস্ত বয়সের উপযোগী করে তোলার প্রয়াসটাকে। যেখানে বহু সিরিজ ওটিটির সেন্সরশিপের বাইরে থাকার সুবিধাটাকে হাতিয়ার করে অকারণ অকথ্য ভাষা ও কয়েকটি অস্বাভাবিক রুচির দৃশ্য ঢুকিয়ে বেকার সীমিত সংখ্যক লোকজনের দেখার জন্য পরিবেশন করছে, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক প্রসঙ্গের সম্ভাবনা দেখলেই তাকে সুচারুরূপে সমস্ত বয়সের উপযোগী করে পরিবেশন করার সাহসী এবং সংযমী প্রয়াসকে সেলাম। প্রতি কাহিনীতে ধারাবাহিকভবে ব্যাপারটাকে ধরে রাখার চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।

এরপর অভিনয়। এতদিনে অনির্বাণ চক্রবর্তী তো একেনবাবুর সাথে প্রায় সমার্থক হয়ে গেছেনই রুপোলী পর্দায়, কিন্তু এবার, সুহোত্র মুখোপাধ্যায় ও সোমক ঘোষ যথাক্রমে বাপীবাবু ও প্রমথবাবু চরিত্রদুটিকে আরো স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত করে ফুটিয়ে তুলে চক্কোত্তিবাবুকে ছাপিয়ে গেছেন! সুহোত্র ও সোমক একেনবাবু সিরিজে প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করে জমিয়ে যুগলবন্দী পরিবেশন করলেন। চরিত্রদুটিতে অভিনয় করা পূর্বতন অভিনেতাদের ছোটোপর্দায় অভিনয়কে ছোটো না করেও বলছি, নতুন এই জুটি সত্যিই অনবদ্য! অবশ্য বড়পর্দায় একেনবাবু ছবিতে এই দুজন আগে এই চরিত্রদুটি করে তারপর সিরিজে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই যেন সিরিজে দুজনে এত সাবলীল, এত মজাদার! তার সাথে শুভ্রজিৎ দত্ত ও বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী দুটি ছোটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে জমিয়ে দিয়েছেন। চরিত্রদুটি ছোটো দৈর্ঘ্যের হলেও, মূল রহস্যের গাম্ভীর্যকে এতটুকু না কমিয়েও হাসিঠাট্টা মেশানো কিছু টাটকা মুহুর্ত উপহার দিয়েছেন। তার সাথে আছেন লোকনাথ দে। ভদ্রলোককে 'মন্দার' থেকে দেখছি যে পর্দায় উপস্থিতির প্রতিটি ক্ষণকে কি এক জাদুতে অসামান্য করে তোলেন, শুধুমাত্র অভিব্যক্তি দিয়ে।

কিন্তু এত করেও সমস্যাটা তাহলে কি হল? সমস্যাটা দেখতে পেলাম গোয়েন্দার সত্ত্বাতে। অপরাধীকে ধরতে গোয়েন্দাকে হতেই হবে কঠিন, প্রয়োজনে রূঢ়, কিন্তু অপরাধীর অসহায়তাকে কি করে অস্বীকার করবে? কি করে অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়ার পরেও অসহায়তাকে নিয়ে খরচ করবে না কোনো মুহুর্ত। কাহিনীকার কি লিখে গেছেন জানি না, তবে পরিচালক হিসেবে জয়দীপ মুখার্জ্জীবাবু ভেবে দেখতে পারেন। না হলে ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরীটি তো কোন ছাড়্, গোয়েন্দা অর্জুনও অনেকটা এগিয়ে থাকবে। উচ্চমানের সত্যসন্ধানী উচ্চ মনের অধিকারী হলে তবেই হৃদয়ে থেকে যাবে।

Sunday, October 16, 2022

Murder by the Sea: হত্যা আর পুরী!

বাঙালী চিত্রপরিচালকদের মধ্যে অঞ্জন দত্তের পরিচালিত ছায়াছবিগুলিকে অসাধারন কেউ বলবে না বোধহয়। তবে সাধারন বলার পরেও তার মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার থাকে যেগুলো আমার চোখে ব্যক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় লাগে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্থান নির্বাচন। উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও কলকাতার গলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে শুধুমাত্র মানুষজন আর তাদের আবেগ ও অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েও যে ছায়াছবি নির্মাণ করা সম্ভব, বোধহয় খুব বেশি পরিচালক ভাবতেও পারেন না। গল্পের স্থানগুলোর ভীষনভাবে বাঙালী পরিবেশ আরও বেশি আকর্ষন করে ও খুব অন্তরঙ্গ করে দেয় ঘটনাগুলোর সাথে। এতদিন তাই কলকাতা ও উত্তরবঙ্গের মানুষজনের সহজাত ও মাঝেমধ্যে অতিমাত্রায় অমার্জিত বাঙালীত্বের স্বাদ দিব্যি লাগছিল। সমুদ্রসৈকতের স্বাদটাও তার সাথে যোগ করে এবার যুক্ত হলো পুরী।

সঠিকভাবে দেখলে পুরীকে ঊড়িষ্যার শহর বলা উচিৎ, কিন্তু সমুদ্রের ধারে বঙ্গোপসাগরের এই পাড়টি ভীষনভাবে বাঙালীদের আপনার। জায়গাটি ঘিরে রহস্যের জাল বোনার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ। রহস্যের শুরুটাও সমুদ্রের পাড়ে এক গুলিবিদ্ধ লাশ থেকে। জলেতে ভিজে থাকা মৃত ব্যক্তিটিকে সাগর সৈকতের বালির মধ্যে আচমকা আবিষ্কার করেন স্নায়বিক রোগে পর্যুদস্ত কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর এক জনপ্রিয় লেখিকা। আশপাশের কিছু ঘটনা ও চরিত্র লেখিকাকে আরও সন্দিহান করে তোলে। হত্যার কারনটা জানতে তিনি হয়ে ওঠেন বদ্ধপরিকর। মনে হয়, এতদিন তিনি যা কল্পনা করে লিখতেন, ঠিক যেন সেরকম কাহিনীর কোনো জায়গায় তিনি ঢুকে পড়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি হয় পড়েন কৌতুহলী। তার মধ্যে যোগ হয় অতীতের কিছু ফেলে আসা ঘটনার রেশ। নিজের অজান্তেই তিনি জড়িয়ে পড়েন অন্ধকার এক রহস্যের পরিবেশে। অতীত ও বর্তমান এক হয়ে তৈরি হয় এক জটিল সমস্যা যা অপরিচিতকে যেমন আপন করে তোলে, চেনা মানুষের লুকোনো কিছু অজানা ঘটনা বেরিয়ে আসে। আচমকা আড়াল থেকে আসে হামলা। এতটা হয়ে ঠিকই ছিল। অনন্যা চ্যাটার্জীর অভিনয়, সুপ্রভাত দাসের পার্শ্বচরিত্রে সাবলীল উপস্থিতি, অঞ্জন দত্তের কাহিনী রহস্যের জালটা গুছিয়ে বুনেছিল। কিন্তু বাদ সাধল সংলাপের আধিক্য এবং এক প্রসঙ্গ বারবার অবতরণ করার প্রবনতা যে অভ্যেসটা পরিচালক বোধহয় কিছুতেই ছাড়তে চাইছেন না। এই জায়গাটা যদি একটু খেয়াল রাখা যায়, পরবর্তী পরিবেশনা অবশ্যই অনেক বেশি রোমাঞ্চকর হবে।

পুরোটা দেখে তবে একটা কথাই বলব যে সিরিজটির বড় প্রাপ্তি হচ্ছে পুরী। অঞ্জন দত্তের ভিন্নমাত্রার ভাবনায় ও প্রভাতেন্দু মণ্ডলের চিত্রগ্রহণে রাতের পুরী, সমুদ্রের দিক থেকে শহরের ড্রোন শট, এক অদেখা সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে। নীল দত্তের পরিচালনায় আবহ সঙ্গীত আরেকটি বড় প্রাপ্তি। এই ব্যাপারটায় অঞ্জন দত্তের পরিচালনা হলে আমার কাছে বরাবরের আকর্ষন থাকে। তাই সিরিজটি দেখুন। তবে রহস্যের জট থেকে আবহের রোমাঞ্চ নিশ্চিতভাবে বেশি মজা দেবে।

Saturday, July 30, 2022

একেই বলে ফেলুদা: ফেলুদা ফেরত ও ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি

কিছু গল্প আছে যা কখনো পুরনো হয় না। কিছু ছায়াছবি আছে যা বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। কিছু মানুষের কথা মনে পড়লেই মনটা ভালো হয়ে যায়। কিছু চরিত্রের কথা মনে পড়লে আবার মনটা সজীব হয়ে যায়। এগুলোর উদাহরণ ক্রমানুসারে দিতে গেলে বলব
- ফেলুদার গল্প
- সোনার কেল্লা
- সত্যজিৎ রায় নামক মানুষটি
- জটায়ু ছদ্মনামের আড়ালে থাকা চরিত্রটি
তাই যেই শুনলাম যে ফেলুদা গোয়েন্দাগিরি শুরু করতে আবার ফেরত আসছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নতুনভাবে রুপোলী আত্মপ্রকাশ দেখতে তৈরি হলাম। গল্পটা নিয়ে মাথাব্যাথা আলাদা করে কখনই কিছু ছিলোনা, পরিচিত কাহিনীর কল্পনার জগত থেকে আসা ফেলুদাকে ছবির পর্দায় যে কিছুক্ষণের জন্য হলেও রক্তমাংসে দেখতে পাবো, ভাবলেই অন্যরকমের আবেশ তৈরি হয় মনের মধ্যে। তারপর তো সাথে আছে তোপসে আর লালমোহনবাবু। সত্যি বলতে কি ফেলুদা নিয়ে ছায়াছবি করলে আকর্ষণটা বেশি থাকে কে অভিনয়টা করছে তার উপর। গল্প তো জানা, কিন্তু গল্পটাকে কিভাবে দেখানো হচ্ছে সেটার উপরই পুরো গুরুত্বটা নির্ভর করে। ব্যাপারটা পুরো বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্নের মতো। জানি যে মাংস হবেই কিন্তু সেটা রোগান জোশ হিসেবে কি রেজালারূপে কি তন্দুরের আড়ালে পেটে প্রবেশ করছে, তার উপরেই পুরো পরিবেশনের সার্থকতা নির্ভর করছে। সত্যজিত, সন্তোষ দত্ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ব্যঞ্জন আমাদের যে তুলনাহীন শিল্পের জাদুতে মাতিয়ে রেখেছিলেন, তার আশা অবশ্য করি না, কিন্তু ফেলুদার উপন্যাস হচ্ছে শুনলেই মনটা কেমন করে ওঠে। মনে হয় এবার বুঝি আবার সেই জাদুটা ফিরে আসবে। ঘটনা হচ্ছে, এবার কিন্তু সত্যিই সেই আশাটা বেড়ে গেল। ফেলুদাকে যেন সেই পুরনো গোয়েন্দাগিরির ঢংএ ফেরত পেলাম। কেউ যেন আমাদের অবশেষে বুঝলেন। পরিচালক সৃজিত মুখার্জ্জীকে তাই সবার প্রথমে কৃতজ্ঞতা জানাই। কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক মোবাইল যুগের সময়োপযোগী করার অহেতুক অস্বাভাবিকতায় না মুড়ে ফেলে পরিচালক ফেলুদাকে খানিকটা হলেও পুরনো নিজস্বতায় ফিরিয়ে এনেছেন। সময়টা কাহিনী অনুযায়ী থাকলে দর্শকদের কয়েক দশক পরেও যে গল্পটার প্রেক্ষাপট বুঝতে অসুবিধে হয় না সেটা নিয়ে বোধহয় এবার আর কোনও সংশয় থাকবে না। রহস্যটা যেখানে আসল, সেখানে কাহিনীর মূল সময়টা কয়েক দশকের পুরনো হলে ক্ষতি কি? যুগটা বরং অবিকৃত রাখলেই তো কাহিনীতে বর্ণিত ঘটনাগুলোর গতিপ্রকৃতি স্বাভাবিক থাকে। সৃজিতবাবুকে সাধুবাদ এই খেয়ালটা রাখার জন্য। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ফেলুদার ভূমিকায় টোটা রায়চৌধুরী। এই ফেলুদা যেন বইয়ের ছবি থেকে উঠে আসা ফেলুদা। বছরকয়েক আগে ‘টিনটোরেটর যীশু’ ছায়াছবিতে এই ভদ্রলোককে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতে দেখে মনে হয়েছিল এই যেন রুপোলী পর্দার জন্য ঠিকঠাক পরের ফেলূদা। সেইজন্য টোটা রায়চৌধুরী অভিনীত ফেলুদা চরিত্রটিকে পেয়ে আমার উৎফুল্লতা দেখে আমাকে পক্ষপাতদুষ্ট লাগতেই পারে। মনের মতো চেহারার ফেলুদা পেলে কে না খুশি হবে? কিন্তু এই খুশিটা যে চিরস্থায়ী হলো না সেখানেই খেদ। সৃজিত-টোটা অনুষ্ঠিত যুগলবন্দী ফেলুদার বাহ্যিক দিকটির দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে ফেলে তার গোয়েন্দা সত্ত্বার সাথে মানানসই ব্যক্তিত্বের দিকটির প্রতি খানিকটা হলেও কম গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন, মাঝেমধ্যেই অকারণ ঔদ্ধত্বের প্রকাশ হয়েছে ফেলুদার সংলাপে যা তার আত্মবিশ্বাসী ধৈর্যশীল চরিত্রের পরিপন্থী। বাচনপটুতা ও বাচনশৈলীর মধ্যে তফাতটা খেয়াল রাখলেই এই সমস্যাটা আর থাকে না। তারপর পরের দিকে যদিও ফেলুদা অনেকটা সাবলীল কিন্তু প্রথমদিকের কাহিনীতে ফেলুদার মেকআপ ভীষনভাবে ‘জয় বাবা ফেলুনাথে’এর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো হয়ে গিয়েছিল যে খোলসের মধ্যের টোটা রায়চৌধুরীকে যেন খুব আড়ষ্ট করে রেখেছিল। তবে সবথেকে যেটা ভালো লেগেছে সেটা হলো জটায়ুর সাথে ফেলুদা আর তোপসের সম্পর্কটা যে নির্ভেজাল বন্ধুত্ব আর রসিকতার সেটা সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলাটা।
তবে ফেলুদাকে নিয়ে যাই বলি না কেন, লালমোহনবাবু কিন্তু ফাটিয়ে দিয়েছে। মানে, জটায়ু চরিত্রে অনির্বাণ চক্কোত্তি যে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন, সেটা কিন্তু হলফ করে বলতে পারা যায়। সন্তোষ দত্তের পরে এরকম জটায়ু আগে চোখে পড়েনি কখনও। একাধারে রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় অথচ ভীতস্বভাবের বাঙালী, অন্যধারে বন্ধুবৎসল ভালোমানুষ গোছের এক মজাদার ব্যক্তিত্ব, মানে জটায়ু বলতে ঠিক যা মনে হয়, অনির্বাণবাবু আমাদের ঠিক সেটাই উপহার দিয়েছেন। জটায়ুর পর্যবেক্ষণক্ষমতা যে সাধারণের মতোই ও সাধারন জ্ঞান অতি সাধারন, সেটা ফেলুদাদের কাছে কখনো ব্যাঙ্গের না হয়ে শুধু সৌহার্দপুর্ণ রসিকতার জায়গাতেই সীমাবদ্ধ সেটা অনেকে বুঝতে পারেন না। লালমোহনবাবুর ব্যক্তিত্ব খর্ব না করেও যে চরিত্রটিকে মজায় মোড়া যায়, সেই কৃতিত্ব চক্রবর্তী-মুখার্জ্জী দেখিয়ে দিয়েছেন। জটায়ু যে কখনোই ফেলুদাদের কাছে উপহাসের পাত্র হতে পারেন না, সেই ব্যাপারটা অনেকেই ধরতে পারেন না। এই পরিচালক পেরেছেন ও সেজন্য ওনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
তুলনায় কল্পন মিত্রকে তোপসের চরিত্রে বেশ খানিকটা ম্রিয়মান লেগেছে। পরের কাহিনীতে তাকে আরেকটু কম সলজজ দেখালে বোধহয় সঠিক দেখাবে।
রম্যদিপ সাহার মনোমুগ্ধকর চলচ্চিত্রায়ণ চারপাশের দৃশ্যগুলিকে যেমন অনন্য মাত্রা দিয়েছে তেমনি তন্ময় চক্রবর্তীর শিল্প নির্দেশনা, সাবর্ণী দাশ রচিত সাজসজ্জা, প্রসেনজিৎ ব্যানার্জ্জী ও মলয় মুখার্জ্জীর মেকআপ চরিত্রগুলিকে গল্পের বর্ণিত সময়ের সাথে উপযোগী করে তুলেছে। জয় সরকারের সঙ্গীতের ও শ্রীজাতর কথায় রূপঙ্কর বাগচী, রূপম ইসলাম, অনিন্দ্য চ্যাটার্জ্জী, শিলাজিত মজুমদার, অনুপম রায় ও সিদ্ধার্থ রায় সুরের জাদুতে ধারাবাহিকগুলোর মুখবন্ধের লগ্ন থেকেই জমিয়ে দিয়েছেন। পার্শ্বচরিত্রে ধৃতিমান চ্যাটার্জ্জী, অরুণ গুহঠাকুরতা, রাহুল ব্যানার্জ্জী, মৈনাক ব্যানার্জ্জী ও সুপ্রভাত দাসের অভিনয় নজর কাড়ার মতো।
তাই বলছি যে ফেলুদা-লালমোহন-তোপসে ভক্তদের কাছে আড্ডাটাইমস ও হইচইতে চলা এই দুটি সিরিজ খুবই চিত্তাকর্ষক লাগবে।
তবে পরিচালকের প্রতি একটাই অনুরোধ। ফেলুদামাত্রেই ছোটোবড় মিলে একসাথে দেখার ছায়াছবি। একটি বিশেষ জায়গায় কিন্তু একটি প্রাপ্তবয়স্কমার্কা দৃশ্যের ঝলক চোখে পড়ল! এরকম দৃশ্য যদি অবতরণ না করা হয়, খুব অসুবিধা হবে কি কারুর? পরিচালক ভবিষ্যতে যদি এই ব্যাপারটা খেয়াল রাখেন, ফেলুদাভক্ত হিসেবে তবে নিশ্চিন্তে থাকা যায়।

Saturday, June 18, 2022

Mahabharat Murders: মহাকাব্য ও motive

প্রথমে দ্রৌপদী, তারপর সহদেব, নকুল, অর্জুন। না, মহাপ্রস্থানের পথে পতন নয়, হত্যা! যেন একালের কোনো কৌরব কোনো অন্ধ প্রতিহিংসায় তার কল্পনার পাণ্ডবদের নিধন করে চলেছে এক এক করে, মহাকাব্যেরই বর্ণিত যোদ্ধাদের বধ করার ছলে। মৃত ব্যক্তিকে তাই কখনো ভীষ্মের শরাসনে দেখা যায়, কখনো দেখা যায় উড়ুভঙ্গ চেহারায়, তো কখনো শরীরটা ফেলা থাকে জরাসন্ধ বধের অবস্থায়! সঙ্গে দেওয়ালে দুটি ছবি আটকানো থাকে। একটির বিষয় – মহাকাব্যে বর্ণিত চরিত্রটির যাকে উদ্দেশ্য করে খুনটা, আর অন্যটি – এখনকার যুধিষ্ঠির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এক আপাতদৃষ্ট সত্যবাদী নেতা ও তার বক্তব্যযুক্ত চিত্র। খুনের কারণ বোঝাটাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবে কি যুধিষ্ঠিরই তার শেষ লক্ষ্য? নাকি আরো কেউ আছে? খুনের সূত্রপাত দ্রৌপদী দিয়েই হল? নাকি তার আগেও কোনো খুন হয়েছে যার কোনো কিনারা হয়নি? খুনি কি এক না অনেক? এরকম হাজার প্রশ্ন আর জটিলতা ভাবিয়ে তোলে পুলিশ কর্মচারী রুকসানা আহমেদ আর যুধিষ্ঠির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নেতা পবিত্র চ্যাটার্জ্জীকে। খুনের এই মহামিছিলের রহস্যভেদ করতে হাতড়াতে হয় অতীতকে। সেখান থেকে উঠে আসে কিছু ভয়ঙ্কর সত্য। বাকিটুকু জানতে দেখতে হবে সৌমিক হালদার পরিচালিত বারো পর্বের এই টানটান উত্তেজনায় ভরা সিরিজ। যেরকম সৌমিক হালদারের পরিচালনা হয়, এরকম জটিলতায় ভরপুর কাহিনী অকারণ গতিময়তার প্রলেপে না মুড়িয়েও টানটান উত্তেজনাটা কাহিনীর শেষ অবধি রেখে যেতে পেরেছেন। এটাই তাঁর সফলতা আর নতুন পরিচালকদের মধ্যে এই জন্য এনার পরিচালনা আমার দারুন লাগে। তার সাথে আছে গল্পের নতুনত্ব। অর্ণব রায় রচিত “The Mahabharat Murders” অবলম্বনে সিজনটি প্রতিহিংসা ও লালসার গতানুগতিক নিয়মে থেকেও এক অনবদ্য মোড় ঘুরিয়ে দেয় কিছু মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষদের ও অন্তরালে থাকা ঘটনার অদ্ভুত পরিসমাপ্তি দেখিয়ে। তবে কিছু জিজ্ঞাস্য থেকেই যায় যেগুলো আপাততুচ্ছ লাগতে পারে কিন্তু কাহিনীর সম্পুর্ণতার জন্য যার সংশয়াতীত ব্যাখ্যার থাকাটা কাম্য ছিল। অভিনয়তে প্রিয়াঙ্কা সরকার মুখ্য চরিত্রে বেশ মানিয়ে গেছেন। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন দেবাশিস মণ্ডল। এই ভদ্রলোক কিন্তু আমার মতে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া। চরিত্র মুখ্য হোক কি গৌণ, সে বেদনার হোক কি ক্রুরতার, সবকিছুই তিনি ফুটিয়ে তোলেন স্বচ্ছন্দ সাবলীলতায়। অন্যদিকে শাশ্বত চ্যাটার্জ্জী আর কৌশিক সেনও হালটা শক্ত করে ধরার জন্য গাম্ভীর্যটা বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়জনকে দেখছি বয়স বাড়ার সাথে সাথে গুরুগম্ভীর চরিত্রে অভিনয় করলে চেহারায় একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠিণ্য ফুটিয়ে তুলে আলাদা মাপের অভিনয় উপহার দিয়ে যাচ্ছেন দর্শকদের। আবার গুরুত্বপূর্ণ আরেক চরিত্রে শাশ্বত অসামান্য। অন্যদের মধ্যে পার্শ্বচরিত্রে ঋষভ বাসুর উপস্থিতি ও অভিনয় চোখে পড়ার মতো লেগেছে। মোটকথা, রোমাঞ্চ ও নাটকীয়তায় ভরা কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি জমাটি সিরিজটি অবশ্যই দেখার দাবী রাখে।

Tuesday, March 8, 2022

রক্তবিলাপ নিয়ে অল্প আলাপ

একটা সিরিজ দেখলাম - রক্তবিলাপ - দেখে নিজেরই বিলাপ করতে ইচ্ছে হলো! মানে রক্ত প্রচুর আছে - পর্বপ্রতি প্রায় দেড়খানা করে লাশ আর হাত কেটে ফেলা, মুখ ফাটিয়ে ফেলাগুলো ধরলে পুরো ব্লাডব্যাঙ্ক উপচে পড়বে। বিলাপও কম নেই - সে ব্যর্থ হৃদয়ের বিলাপই হোক কি মোবাইল নেটওয়ার্ক না পাওয়ার বিলাপ - সব ছিল। মুশকিলটা হলো যে রক্ত যুক্ত বিলাপ = রক্তবিলাপ সন্ধিটা করতে গিয়ে কেসটা পুরো জণ্ডিস হয়ে গেল।

ঘটনাটা হলো, কলেজের সাত বন্ধু - রক্তিম, সঞ্জনা (চরিত্রটির সাথে অবাঙালী কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করেও কোনও অজ্ঞাত কারণে নামটার উচ্চারণ সাঞ্জানা করা হয়েছে, যদিও নামটার বাঙলা উচ্চারণ হয়ত রঞ্জনার মতো হতে পারত), মোক্ষ, অভি, মিয়া, গৌরব, সানি তাদের আরেক কলেজবন্ধু, মায়ার বাড়ি বেড়াতে যায়। উদ্দেশ্য - রক্তিম ও সঞ্জনার আসন্ন বিবাহের সম্ভাবনায় এক ব্যাচেলর্স পার্টি। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে মায়া একে কলেজের সবথেকে আপাত নিরীহ গোবেচারা মেয়ে, তার উপর সবাই জানে তার অসুস্থ মা শয্যাশায়ী। তবুও মায়া তার বাড়িতে হুল্লোড়টা যখন আয়োজন করে, তখন সবাই কি স্বাভাবিকভাবে সেটা মেনে নেয়। মানছি যে যুবসমাজ যুগে যুগে নচ্ছার জাতীয় হিসেবে পরিচিতি পেয়ে থাকে, তবে আমার মতে এতটাও নয় যে অসুস্থ মায়ের কথা জেনেও উদ্দাম আনন্দে রাত কাটানোর কথা সাত-সাতজন মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে মেনে নেবে। আবার সেটা মানার চেষ্টা করলেও সমস্যা হয় এটা বুঝতে যে বন্ধুর বাড়িতে এসে তার অসুস্থ মাকে চোখে দেখার কোনো জোরালো তাগিদ কেন থাকে না কারুর মধ্যে। অবশ্য গল্পের গরু তো গাছে চড়েই থাকে আর এটা তো মাত্র এক রাতের ব্যাপার, তাহলে বেশি চিন্তা না করে সেই গাছের মগডাল থেকে বাকিটার সম্বন্ধে বলে নিই।

শহরের বাইরে মায়ার বাড়িতে তো সবাই পৌঁছয়। দেখা যায় তারা পৌঁছে গেলেও মোবাইল টাওয়ার হারিয়ে গেছে। তো এসব ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই পাত্তা না দিয়ে রাতভর জমিয়ে পার্টি বসে। জলসা অবশ্য রাত বাড়তে চটকে যায় মাঝপথেই বন্ধুদের মধ্যে চলা বচসার জেরে। ব্যস, তারপর আর কি, সেই প্রায় খালি প্রকাণ্ড বাড়িটার আনাচে কানাচে ক্ষিপ্ত, বিরক্ত ও অভিমানী বন্ধুর দল ছিটকে বেরিয়ে পড়ে মনগুলোকে শান্ত করতে, আর তারপরেই শুরু হয় লাশের মিছিল। প্রথমটা বাগানে রাখা একটা বাথটবে, দ্বিতীয়টা রান্নাঘরে, তৃতীয়টা বেডরুমে, চতুর্থটা - না থাক আর বলব না, মানে লাশগুলো যেন বাড়িটার দ্রষ্টব্য জায়গা চিহ্নিত করতে থাকে আর বাড়িটাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাকিরা যারা তখনও জীবন্ত তারা টেরও পায় না। এমনকি একজনের খুনটা দেখায় খুনী যন্ত্রের মতো বারবার ছুরির আঘাত করছে আর যে খুন হচ্ছে সে হচ্ছে সাত চড়ে রা না কাটার অর্ধমৃত প্রতিমূর্তি।  ছুরি খাওয়াটা তার জীবনে যেন কানমলা খাওয়ার মতো স্বাভাবিক ব্যাপার যদিও কানমলা খেলেও লোকে যথেষ্ট সবাক প্রতিবাদ বা আর্তনাদ করে। যাইহোক, মৃত্যুগুলো কিন্তু প্রতিবার জানান দিয়ে হয়। ঘরের মধ্যে আলো দপদপ করে, একটা গ্রামোফোন নিজে নিজেই বেজে চলে। তা সত্ত্বেও মায়াকে কেউ জিজ্ঞেস করে না এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার কেন হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। আতঙ্কিত লোকজন বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে দেখে সেখানকার একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ কিন্তু কি করে জানি সেখানে জনৈক প্রেততত্ত্ববিদ প্রবেশ করে। বোধহয় আধিভৌতিক ব্যাপারে যারা পারদর্শী তারা পাঁচিল টপকানো বিদ্যা আয়ত্ত করেছে, বাকিদের বিশেষ এই জ্ঞানটি নেই, নয়তো বেছে বেছে প্রেততত্ত্ব গবেষকদের জন্য প্রবেশপথ একমাত্র খোলে। অকুতোভয় এই বাঙালী গবেষকের আবার নাক কুঁচকে ওঠে ভুতকে ভুত বললে। জানতে পারা যায় যে ঠিকটা হবে স্পিরিট, আজকাল 'আত্মা' নামক বস্তুটা বোধহয় ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে। কারণ আলাদা প্রকৃতির স্পিরিট সেবিত জনতার কাছে স্পিরিট আর ভুতের তারতম্য কতটা বোঝানো গেল কে জানে? আবার এই ভদ্রলোক কি একটা যন্ত্র বের করে সেটার চার ইঞ্চির থেকেও ছোটো স্ক্রিনে কি দেখলেন, ব্যাস ভৌতিক কার্যকলাপ মুহুর্তের মধ্যে ধরে ফেললেন। গল্প পুরো তরতর করে এগিয়ে চলে যদিও শেষে গিয়ে আবার সমস্তটা আমার গুলিয়ে যায়। বিচিত্র আরেকটি চরিত্র হচ্ছে মায়াদের বাড়ির পুরনো কেয়ারটেকার, রফিককাকা। ভদ্রলোককে দেখে বিজ্ঞানের ছাত্রদের শ্রোডিঞ্জারের ওয়েভ মেকানিক্স মনে পড়তে পারে। মানে চরিত্রটি যে কি করে একবার বাগানে তো পরমুহুর্তে অন্দরমহলে চলে আসতে পারে আর বাড়িটাতে বিশেষ কিছু ঘটনার মুহুর্তে সেই জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারে বুঝতে গেলে কোয়াণ্টাম মেকানিক্স ছাড়া উপায় নেই। তো এরকম কিছু বিচিত্র চরিত্র ও ঘটনা দেখে ভয়ানক লাগতেই পারে তবে আতঙ্ক পাওয়াটা সম্পুর্ণ দর্শকের উপর।

তাই পরের গল্পের জন্য পরিচালক জুটি - অর্নিত ছেত্রী ও মণিদীপ সাহা - দুজনকেই অনুরোধ যে আরেকটু যদি মনোযোগ দেওয়া যায় তাহলে দেখার আকর্ষণটা বাড়বে বই কমবে না। একক দক্ষতায় সপ্তর্ষি মৌলিক ও সোহিনী সরকার চেষ্টা করলেও গা ছমছমে রূপ দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বরং অলিভিয়া সরকার, প্রান্তিক বন্দোপাধ্যায় ও চান্দ্রেয়ী ঘোষ ছোটো ভূমিকায় যথাযথ।

Thursday, February 17, 2022

কে ব্যাধ

রজতাভ আছে, খরাজ আছে, তার উপর অনির্বাণ চক্রবর্তী পর্যন্ত আছে। মানে ব্যাপারটা পুরো জমে কুলপি করার জন্য যা উপকরণ দরকার সমস্তটা ছিল! কিন্তু তাও গণ্ডগোল রয়ে গেল। মুশকিল হচ্ছে, রজতাভ দত্ত, খরাজ মুখার্জ্জী, অনির্বাণ চক্রবর্তী প্রমুখ বলিষ্ঠ অভিনেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করতে খানিকটা সাবলীলতা দরকার। তবে সেই সাবলীলতার অভাব বাকি অভিনেতাদের খামতির জন্য না পরিচালকের ভুলে সেটা অবশ্য বলা মুশকিল।

গল্পটার প্লট নতুন রকমের! রাজর্ষি দাস ভৌমিকের 'চড়াই হত্যা রহস্য' অবলম্বনে রচিত ধারাবাহিকটি অভিরূপ ঘোষ কেন, যেকোনো পরিচালকের জন্যই সাহসী পদক্ষেপ। মানুষ খুন নিয়ে তো গল্প প্রচুর আছে, কিন্তু চড়াই পাখিদের হত্যা নিয়ে যে কাহিনী হতে পারে এবং তার উপর ভিত্তি করে রুপোলি পর্দায় পরিবেশন করা, আছে কি? এই ব্যাপারে পরিচালক অনেকের থেকে এগিয়ে।

তার সাথে আবার যোগ হয়েছে লালবাজারের কাল্পনিক এক বিভাগ - অস্বাভাবিক অপরাধ বিভাগ, যার ইংরেজী নাম ডিপার্টমেন্ট অফ আনইউজুয়াল কেসেস। গালভরা এই পোষাকি নামের আড়ালে যে বিভাগটি বিরাজমান, সেটা আদতে চাকরীর পানিশমেণ্ট পোস্টিং। কোনো অফিসারের উপর ডিপার্টমেণ্ট খাপ্পা হলেই, তাকে পাঠানো হয় এখানে। বিভাগীয় প্রধান এবং আপাতদৃষ্টিতে বহুদিনের একমাত্র পার্মানেণ্ট কর্মচারী কানাই চরণ দাসের ভাষায়, এই পোস্টিংএ বাকিদের মেয়াদ তিন মাস, তারপরেই স্বভাব ঠিক হলেই স্বাভাবিক জায়গায় বদলি।

যাইহোক, বিভাগ যখন অস্বাভাবিক অপরাধের, তাই পাখি খুনের তদন্ত যে এদের এক্তিয়ারে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে যে দর্শকরা কিন্তু প্রথমেই জেনে যাবে কে এগুলো করছে। কিন্তু ঘটনা হল, কেন যে বেছে বেছে চড়াই পাখিদের দলকে দল মেরে ফেলার প্রচেষ্টা হচ্ছে বিভিন্ন গ্রামে, রহস্যটা সেখানেই। তাই আনইউজুয়াল কেস বিভাগ যখন খুনিকে ধরতে মাথা ঘামাবে, দর্শকেরাও ভাববে এই আপাত অস্বাভাবিক খুনের কারন বার করতে।

স্বচ্ছন্দ গতির এই নতুন আঙ্গিকের সিরিজটি প্লটের চমক তো দিয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক অভিনয় ও পরিচালকের মনোযোগ যদি আরেকটু উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হইচইয়ের এই সিরিজটির ভবিষ্যত অস্বাভাবিকভাবে আকর্ষণীয় হওয়ার ক্ষমতা রাখবে।

Thursday, January 13, 2022

গোরা....কাণ্ড

বাঙালী দর্শকমাত্রেই গোয়েন্দা গল্পের পোকা! আর রহস্য রোমাঞ্চ ধারাবাহিক হলে তো কথাই নেই, টি আর পি এমনি এমনি বেড়ে যাবে। জানা কথা যে গল্পের শেষে গোয়েন্দা ঠিক অপরাধী ধরে ফেলবে। তবুও গোয়েন্দা গল্প এক অমোঘ আকর্ষণ বাঙালী দর্শকমাত্রে।  বলতে কি, অনেকটা এই কারণেই আমার গোরা দেখার সূত্রপাত। আরো একটা কারণ অবশ্য ছিল, তবে গৌণ - ঋত্বিক। এই ভদ্রলোকের অভিনয় আমার বেশ লাগে এবং গোয়েন্দা চরিত্রে তিনি কি করেন সেটা দেখার আলাদা করে বাসনা ছিল। এর আগে ব্যোমকেশের বন্ধু হিসেবে অজিতের চরিত্রে দেখেছি। এবার গোয়েন্দা হিসেবে কেমন দেখব ভাবছিলাম। তবে মুলতঃ গোয়েন্দা কাহিনীর টানেই কিন্তু সিরিজটা দেখতে শুরু করি।

কিন্তু প্রথম পর্বে দৃশ্যে পদার্পণ মাত্রেই এবং পর্বটা খতম হওয়ার আগেই আমার গৌণ উদ্দেশ্যটাই আসল হয়ে গেল এবং সিজনটি শেষ হবার আগেই ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনীত গোরা চরিত্রটি এতটাই আমার কাছে প্রাধাণ্য পেয়ে গেল যে, গল্পে যদি গরুকে গাছে চড়ানো দেখানোও হত, আমি তবুও বসে বসে তাই দেখতাম। এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় আমি শেষ কার থেকে কবে দেখেছি জানি না। বেসুরো গান পাগলা, সাঙ্ঘাতিক খ্যাপাটে, প্রচন্ড ভুলো, নাম পর্যন্ত মনে না রাখতে পারা, জগতের যাবতীয় স্বাভাবিকতা সম্বন্ধে উদাসীন, কিন্তু তীব্র নজর আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী শক্তির অধিকারী গোয়েন্দা চরিত্রে ঋত্বিক গোড়াতেই ফাটাফাটি। অবশ্য সত্যি করে বললে কিন্তু ফাটাফাটিটা আমি ঋত্বিককে বললাম না গোরা চরিত্রটাকে বললাম সেটা ঠিক বলতে পারবো না। কারণ গোরা চরিত্রটার মধ্যে ঋত্বিক এমন করে মিশে গেছেন যে আলাদা করতে অন্য গোয়েন্দা লাগবে! সত্যি বলছি গল্পটায় এমন কিছু নেই যাতে একে রুদ্ধশ্বাস প্লট বলা যায়, উপরন্তু বেশ কয়েকটি জায়গায় বালকসুলভ গণ্ডগোল আর অতি সরলীকরণ আছে যেটা গোয়েন্দা গল্পে বেশ দৃষ্টিকটু। কিন্তু তাও বলছি, পর্বগুলি ঋত্বিকের অভিনয় আর প্লটের স্বচ্ছন্দ গতির দৌলতে যেন এক টুকরো মুক্ত বাতাস উপহার দিয়েছে আমাদের। গোয়েন্দা গল্পে হাস্যরসের সঠিক মিশ্রণ আজকাল বেশি দেখতে পাওয়া যায় না। কোথাও অস্বাভাবিক রকমের অতিরিক্ত হয়ে যায় তো কোথাও একদমই অনুপস্থিত থাকে। এখানে মজা আছে তো বটেই, যেখানগুলো অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারত সেই জায়গাগুলোতেও পরিচালনা ও অভিনয়ের অসামান্যতায় হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। মজার মোড়কে পরিবেশিত সাহানা দত্তের কাহিনীর রহস্য তার গাম্ভীর্য তো হারায়নি, বরং হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও সজীব। যেরকম তিনি দুটি গল্পকে মিশিয়ে ব্যোমকেশ সিরিজ তৈরি করেছিলেন, তেমনি সায়ন্তন ঘোষাল এখানেও দুটি গল্পকে একটি কাহিনীর মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আবার গোরাকে প্রশাসন যদিও ধারাবাহিক খুন বিশেষজ্ঞ বলে অভিহিত করেছে, কিন্তু অন্যান্য অপরাধ সম্বন্ধেও গোরা সমান ওয়াকিবহাল। একারণে সে যদিও লেখকদের রহস্যময় খুনের তদন্তে সিরিয়াল কিলার ধরতে পুলিশকে সাহায্য করতে তৈরি, কিন্তু যখন এক গৃহবধূ তার স্লিপওয়াকিং নিয়ে এক অস্বাভাবিক ঘটনার উত্থাপন করে, সমস্যাটা তার কৌতুহল উদ্রেক করে। তবে এই কেসে সে অকুস্থলে যাওয়ার তাগিদ দেখায় না কিন্তু সমাধানের উপায় বাতলে দেয়। রহস্যে ভরা পরিবেশকে আরো চিত্তাকর্ষক করেছে অয়ন ভট্টাচার্য ও বিনীত রঞ্জন মৈত্রর ধ্বনির ও সুরের জমকালো ভারসাম্য। গোরার খামখেয়ালের সাথে তাল রেখে একাধারে তার বন্ধু, সহকারি আবার হবু ভগ্নীপতির চরিত্রে সুহোত্র মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। বহুদিন বাদে গোয়েন্দা চরিত্রটির সাথে সমান তালে পাল্লা দেওয়া এক শাগরেদ চরিত্র পেলাম যে বন্ধুর পিছনে লাগা আর দরকার বা অদরকারে পাশে থাকতে সমান উৎসাহী। ঈশা সাহার চরিত্রটিতে চমকের একটা নতুনত্ব আছে তবে অভিনয়তে বিশেষ কিছু করার নেই। তবে পরবর্তী সিজনে যে তিনি বেশি কিছু করার সুযোগ পাবেন তার ইঙ্গিত যেমন আছে তেমনি সেখানে ঋত্বিকের পাশে দাপটের সাথে যে তিনি অভিনয় করবেন, তারও যথেষ্ট আভাস আছে।

তাই সময় নষ্ট না করে গায়কিতে ক্যাকোফনিক্স, দেমাকে পোয়ারো, রূপে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাগলা জগাই আর খামখেয়ালে একদম নিজস্ব, ভুলোমনা গোরার সিরিজটি দেখুন ও কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান বিচিত্র কিছু রহস্যের খাসমহলে!

Saturday, December 4, 2021

মন্দার.....অসাধারনের মাঝে সাধারন

যেটা হওয়ার কথা ছিল অনন্যসাধারণ, সেটা সাধারণ আর অসাধারণের মাঝে ঝুলে রইল। কিন্তু এরকম তো হওয়ার ছিল না। সমস্ত উপাদান তো মজুত ছিল। কিন্তু মন তো ভরল না পুরো। কোথায় যেন গণ্ডগোল থেকে গেল। অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালক বলে কি প্রত্যাশাটা খুব বেড়ে গেছিল? ব্যাপারটা কি অন্যরকম কিছু হবে ভেবেছিলাম? খানিকটা যে তাই তা বলাই বাহুল্য। অভিনেতা অনির্বাণের প্রথম পরিচালনা দেখার আগ্রহ যথেষ্ট ছিল। তাহলে তো আগে দেখতে হয় পরিচালক অনির্বাণ কি করেছেন।

পুরোটা সংক্ষেপে বোঝাতে হলে বলতে হবে মাৎ করে দিয়েছেন। প্রেক্ষাপট নির্বাচন, চরিত্র নির্বাচন, ভাষার নির্বাচন - এগুলো তো বটেই কিন্তু এদের মধ্যে সাযুজ্য বজায় রাখার সামগ্রিক নিষ্ঠা সমসাময়িক যুগের বিচারে অতুলনীয়। অভিনেতাদের নিজস্ব অভিনয় ক্ষমতা সম্বন্ধে কোনোরকম মন্তব্য না করেও চয়ন দেখে যেন মনে হয় তাঁদের জন্যই চরিত্রগুলো গড়া। চিত্রায়ণে সৌমিক হালদার এক অনন্য মাত্রা দিয়েছেন সমস্ত উপস্থাপনাটিকে। কাহিনীর প্লট অনুযায়ী ড্রোন শট হোক কি চেহারার ক্লোজ আপ, প্রায় প্রত্যেকটি শট নির্ভুলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে মানবজাতির কদর্য বাস্তব। হিংসার তাড়না, প্রতিহিংসার উল্লাস, লালসার বিভৎসতা, মানসিক বিকৃতি, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রবৃত্তির বর্বর রূপ ও ঘটনার রূপকারদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশকে নির্ভুল অথচ শিল্পের অনবদ্য আঙ্গিকে ধরা হয়েছে। চিত্রের ভারসাম্য বজায় রেখে সমকৃতিত্ব দাবী করে সোমনাথ কুণ্ডুর সাজসজ্জা বিভাগ।

ম্যাকবেথ অবলম্বনে তৈরি মন্দারের পটভূমি গেইলপুর নামক এক সৈকত নগর। সেখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশ মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ভুক্ত। গোষ্ঠীর ব্যাবসার দিকটা চলে তাদের সর্দার ডাবলুভাইএর (কিং ডানকান) নেতৃত্বে। কঠিন হাতে কর্তৃত্ব জারি রাখতে খুন-জখম-ত্রাসসঞ্চার করার অন্ধকার দিকটা দেখার জন্য তার ভরসার লোক মন্দার (ম্যাকবেথ) ও বঙ্কা (ব্যাঙ্কো)। ক্রুরতা ও রহস্যে ঘেরা কিছু ঘটনার স্রোত এদের তিনজনের মনে আশঙ্কা-সন্দেহ-লালসার বীজ বপন করে দিল। তারপর শুরু হলো ক্ষমতা কায়েম ও প্রতিহিংসার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। অবিশ্বাস ও স্বার্থপরতার এক অন্ধকার লড়াইয়ে প্রাণের মূল্য হয়ে গেল গৌণ। ভাগ্যের পরিহাসে রাজার আসন দখলের আকাঙ্খায় বন্ধু হয়ে পড়ল শত্রু, শক্তির মত্ততায় পরমাত্মীয় হেলায় নেমে গেল ব্যাভিচারের অতলে। লালসার এই ঘৃণ্য আসর ম্যাকবেথের পঞ্চ অঙ্কের মতোই পাঁচ পর্বে সমাপ্ত। শেক্সপিয়রের অনুপ্রেরণায় রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়, প্রতীক দত্ত ও পরিচালকের নিজের কলমের ফসল এই কাহিনীর গতিময়তা ও শ্বাসরোধকারী মুহুর্তগুলো প্রতীকবাবুর ঠাসবুনট চিত্রনাট্যে প্রায় অধিকাংশক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছে এক ভয়াল বাস্তবের প্রতিবিম্ব।

অভিনয়তে মুখ্য চরিত্র বাদ দিয়েও পার্শ্বচরিত্রে লোকনাথ দে (মদন) ও শঙ্কর দেবনাথ (বঙ্কা) অসাধারন। সোহিনী সরকারও (লাইলি) একাধারে অসহায়, আবার পরক্ষণেই নির্মম চরিত্রে কঠিন ও সুন্দর। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে দেবেশ রায়চৌধুরী (ডাবলুভাই) ও দেবাশিস মণ্ডল (মন্দার) দুই মুখ্য ভূমিকায় অনবদ্য। চরিত্রদের সাথে একাত্ম হয়ে পড়া এই দুজনের অভিনয় মান নিয়ে যে কোনো প্রকারের তারিফই কম শুনতে লাগবে। বিপরীতে অনির্বাণ (মুকদ্দর মুখার্জি) নিজে প্রয়োজনের অধিক মৃয়মান।

এবার তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এতকিছুর পর সমস্যার কথাটা উল্লেখ করলাম কেন? করলাম তিনটি প্রধান কারণে যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ঠিক লাগেনি। প্রথমত, চরিত্রদের নীচ মনোবৃত্তি বোঝানোর জন্য অশ্লীলতা পরিবেশনার মধ্যে যদি কিছুটা অন্যরকম কিছু করে দেখানো যেতো তাহলে বলতাম যে নতুন কিছু দেখলাম। সেখানে নতুন দেখলাম বটে, তবে তা শিল্পগুণে অত্যন্ত সাধারণ বললেও অত্যুক্তি হবে। দ্বিতীয়ত, সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি ওয়েব সিরিজ। তাহলে নাটকীয়তার আধিক্য থাকাটা অনুচিত। থাকলে সেটা বেশ অস্বস্তিকর লাগে। মন্দারের মশারী জড়িয়ে জালে পড়ে যাওয়া প্রভৃতি দৃশ্য শিল্প হিসেবে উচ্চ মানের হতেই পারে, কিন্তু এরকম কিছু নাটকীয়তার প্রাবল্য ছোটোপর্দার দৃশ্য হিসেবে বিসদৃশ্য ও দৃশ্যের ধারাবাহিকতাকে হঠাৎ করে যেন অকারণ অস্বাভাবিকতার প্রলেপ দিয়ে দৃশ্যের মান সাধারন করে দিয়েছে। তৃতীয় হচ্ছে বিষয়। কয়েকটি চলচ্চিত্রের উল্লেখ করে জিনিসটা বোঝানোর চেষ্টা করব। একটি হলিউডি, দুটি বলিউডি ও দুটি টলিউডি। শেক্সপীয়রের 'ম্যাকবেথ' অনুসরণে বিশাল ভরদ্বাজের 'মকবুল', 'জুলিয়াস সিজার' ও 'অ্যাণ্টনি অ্যাণ্ড ক্লিওপেট্রা' অবলম্বনে সৃজিত মুখার্জির জুলফিকর (অনির্বাণ যার কিছু ঝলক ব্যবহার করেছেন প্রায় সমান্তরাল এক পরিস্থিতিতে), 'হ্যামলেট' অনুসরণে অঞ্জন দত্তের 'হেমন্ত', 'ওথেলো' অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজের 'ওমকারা' ও টিম ব্লেক নেলসনের 'ও'। আশ্চর্যভাবে অঞ্জন দত্তেরটা বাদ দিয়ে বাকি তিনটি ভারতীয় সংস্করণ সমাজবিরোহীদের অন্ধকার জগতের প্রেক্ষাপটে রচিত। কিন্তু এই প্রলোভনের হাতছানি এড়িয়ে বেশ অদ্ভুতভাবে নেলসন নির্মিত আধুনিক ওথেলো মানুষের অন্ধকার দিকটা দেখিয়েছেন আপাত শিক্ষিত সমাজের প্রেক্ষিতে এবং তাই হয়ে উঠেছে মৌলিকতায় ভাস্বর। অঞ্জন দত্ত চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাঁরটাও প্রতিশোধের প্রেক্ষিতে প্রায়ান্ধকার পরিবেশে পর্যবসিত। তবে কি হলিউড শুধু শিখিয়েই যাবে আর আমরা শিখেই যাব? হিংসা-প্রতিশোধ মানেই যে অন্ধকার জগত নয় সেটা কবে বুঝব? আইনের হাত এড়িয়ে অন্যায়ের শাস্তি বোধহয় শেক্সপীয়র চাননি। 'ম্যাকবেথ' পড়া থাকলে ও 'মকবুল' দেখা থাকলে 'মন্দার'-এ নতুন কিছু নেই। এখানেই খেদ! সমকালীন যুগে অনির্বাণ এক আলাদা মাপের অভিনেতা। সেকারণে তাঁর থেকে পরিচালনাটা আরো মৌলিক চেয়েছিলাম। পেলাম না, তবে অপেক্ষা করব ভবিষ্যতের চাকার মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য।

Thursday, November 18, 2021

অদ্বিতীয় ব্যোমকেশ

হইচইয়ে এই মাসে সৌমিক হালদার পরিচালিত ব্যোমকেশ ওয়েব সিরিজের সপ্তম সিজন প্রদর্শিত হল। খুব আগ্রহ সহকারে দেখলাম। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় রচিত চোরাবালি গল্প অবলম্বনে সৌগত বসুর গতিময় চিত্রনাট্য শৌভিক বসুর নিপুণ চিত্রায়নে এক শৈল্পিক আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় ব্যোমকেশের চরিত্রে। অজিতের চরিত্রে সুপ্রভাত দাস সাথে সাথে চতুর্থ সিজন থেকে সুব্রত দত্তের পরিবর্ত হিসেবে কাজ করছেন কিন্তু দুজনেই চরিত্রটির স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত আশ্চর্যভাবে সমরূপে ধরে রেখেছেন যা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবী করে। বিপরীতে সত্যবতী চরিত্রে রিদ্ধিমা ঘোষ যোগ্য সঙ্গত রেখেছেন মুখ্য ব্যক্তিত্বের সাথে। পার্শ্বচরিত্রগুলির মধ্যে অর্জুন চক্রবর্তী বোধহয় হিমাংশু চরিত্রের শিকারী সত্ত্বার সাথে অতিমাত্রায় একাত্ম হতে গিয়ে খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে পড়েছেন আর কিঞ্জল নন্দ হিমাংশুর বন্ধু কুমার ত্রিদিবের বন্ধুবৎসল জমিদারী ব্যক্তিত্বের সাথে মিশে থেকেও মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। তবে দেওয়ান কালিগতির ভূমিকায় চন্দন সেন অনবদ্য। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে স্বীকার করতেই হবে এবারের পরিবেশনাটিও বাকিগুলির মতোই আকর্ষণীয় এবং তাদের মতোই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের ছাপ রেখে পরিণতবয়স্কদের প্রসঙ্গ অবতারণা করলেও পরিচ্ছন্ন।

সমস্যা হচ্ছে পরিমিতি বোধটা অধিকাংশ জায়গায় থাকলেও পুরোপুরি থাকেনি। গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রের মধ্যে আমার কাছে ব্যোমকেশ উপরের সারিতে থাকবে। তাই তাকে নিয়ে বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেখলে ঠিক মনে হয় না। সায়ন্তন ঘোষাল পরিচালিত প্রথম সিজনে দুটি গল্পকে সমান্তরালে পরিবেশন করা হয়েছিল। সত্যান্বেষীর সাথে পথের কাঁটা, অর্থমনর্থমের সাথে মাকড়সার রস, বিষয় অথবা চরিত্রদের সামঞ্জস্য ব্যবহার করে একসাথে দুটি প্লটকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এক অভিনবত্বের সুচনা করেছিলেন পরিচালক। ভালো লেগেছিল। একই ভাবনার ব্যবহার পঞ্চম সিজনে দেখা গেছিল। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এই সিজনেরই পরিচালক। বাঙলার কুখ্যাত মন্বন্তরের পরিপ্রেক্ষিতে দুষ্টচক্র ও খুঁজি খুঁজি নারি উপস্থাপনা করা হয়েছিল। এবারের দুটি পর্বের মতোই সেবারও পর্বের সংখ্যা ছিল এক জোড়া। ষষ্ঠ সিজনে পেলাম মগ্ন মৈনাক যা আমার মতে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পঞ্চম সিজন থেকেই ব্যোমকেশের মধ্যে সমাজের অসহায়তার প্রতি একটা রাগ-দুঃখ-অভিমান পরিস্ফুট হতে দেখা গেল যা শুধুমাত্র তার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, অন্যের সাথে কথাবার্তায় বেরিয়ে পড়তে লাগল, আর বেরোতে লাগল তার কাব্যিক সত্ত্বা। ব্যোমকেশ যেন আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু সেটার জন্য এই অতিনাটকীয়তার পরিবেশ অপ্রয়োজনীয়। কারণ ব্যোমকেশের গোয়েন্দাদের আবশ্যিক শর্তের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি বিশ্লেষণ ক্ষমতাও তীব্র। কিন্তু এসবের উপর অসাধারন দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তার অন্যান্য গোয়েন্দাদের থেকে স্বতন্ত্র থাকার প্রধান কারণ তার সত্যের অনুসন্ধানের প্রতি একনিষ্ঠতা। তার আবেগ হচ্ছে সত্যকে জানার আবেগ, এতেই তার প্রধান সন্তুষ্টি, এটাই তার আসক্তি, সত্যকে জানার লক্ষে সে অবিচল। সে অবশ্যই সংসারী হতে পারে, পারিপার্শ্বিকতার অসহায়তা তার মনকে করুণ করতেই পারে। কিন্তু আমার মতে, সে এগুলোর প্রকাশ কারুর সমক্ষে করবে না। তার কষ্ট, বেদনা হবে তার একান্ত আপনার। যা অজিতের সাহিত্যিক মনকে সহজে নাড়া দিতে পারবে বা সত্যবতীর নারীহৃদয়কে সহজেই স্পর্শ করবে, সেই একই ব্যাপার ব্যোমকেশের যুক্তিবাদী মনকে তার মূলে অনুসন্ধান করতে প্ররোচিত করবে আর যদি সে বুঝতে পারে যেই সমস্যার সমাধানে তার অসহায়তা, সে অস্থির হবে, কিন্তু সে থাকবে নিরব কারণ বৃথা আলোচনার দ্বারা যে কিছু হওয়ার নয় সেটা অন্যেরা না বুঝলেও সে অবশ্যই বোঝে। সমাজের তথা সামাজিক জীবের মনস্তত্ত্ব যার নখদর্পণে, সেই হবে অজিত ও সত্যবতীর মানসিক সহায় কারণ উপযুক্ত শ্রোতা যদি ধৈর্য সহকারে অসহায়তার মনস্তত্ত্ব বুঝতে আগ্রহী হয় তাহলে তার থেকে বিচক্ষণ শিক্ষকের জুড়ি মেলা ভার। সংসারী ব্যোমকেশের সাংসারিক জীবনে সাহিত্যের বাহ্যিক প্রকাশের জন্য অজিত উপস্থিত, আছে সত্যবতীর মতো বুদ্ধিমতি শিক্ষানুরাগী স্ত্রী, কিন্তু সত্যান্বষণের পথে নিবেদিত হৃদয়, ব্যোমকেশের প্রাণে সাহিত্য সঞ্চার প্রয়োজন না থাকলে অনভিপ্রেত।

এত কথা বলছি এই কারণেই যে এই সিরিজগুলি পরিবেশনায় অন্যান্য অনেক ব্যোমকেশের চিত্রায়িত উপস্থাপনার থেকে শুধুমাত্র তার পরিমিতি বোধের কারণে আকর্ষণীয় এবং স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল। সিজনগুলির পরিচালকদের মধ্যে উল্লেখিত দুজন ছাড়াও সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ও একই ধারা বজায় রেখেছেন যা অবশ্যই আন্তরিক অভিনন্দনের অধিকারী। তাই সবার থেকে আলাদা বহু প্রতিক্ষিত এই সিজনগুলির এই ত্রুটিটুকু না থাকলে সিরিজটি সর্বতোভাবে সুন্দর হতে পারবে।

সপ্তম সিজনে ফিরে এসে দুটো সমস্যার উপর আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত, শরদিন্দু বর্ণিত হিমাংশু প্রকৃতিতে উদার ছিলেন। তাকে অমলিন করে দিয়ে খুব কি লাভ হলো? উপরন্তু তার প্রতি ব্যোমকেশ নির্ধারিত শাস্তির মাত্রা বিচারককে তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিকারপ্রিয় হিমাংশুকে যদি সর্বক্ষণ শিকারীর পোষাকে দেখা যায়, সেটাও দৃষ্টিকটু লাগে!

এই মুহুর্তে অপ্রাসঙ্গিক লাগলেও আরেকটি ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাঙলা রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্যে শরদিন্দু ও সত্যজিৎ দুই বলিষ্ঠ রূপকার। শরদিন্দুর সৃষ্ট ব্যোমকেশ ও সত্যজিতের কল্পনার ফেলুদা অমর হয়ে আছে তাদের নিজস্বতায়। এই সিজনের একটি দৃশ্যে ছোট্ট বেবির সাথে ব্যোমকেশের পরিচয় এবং আলাপ জয় বাবা ফেলুনাথে চিত্রায়িত ফেলুদার সাথে রুকুর পরিচয়পর্ব স্মরণ করায়। দৃশ্যটির অবতারণা অনাবশ্যক এবং পরবর্তী পর্যায়ে রায়পরিবার নিয়ে আলোচনা ভীষন ভাবে কৃত্রিম। শরদিন্দু আর সত্যজিত যে যার আপন সৃষ্টির মধ্যেই উজ্জ্বল। তাদের সেরকমভাবে মনে রাখাই শ্রেয়।