প্রথমে দ্রৌপদী, তারপর সহদেব, নকুল, অর্জুন। না, মহাপ্রস্থানের পথে পতন নয়, হত্যা! যেন একালের কোনো কৌরব কোনো অন্ধ প্রতিহিংসায় তার কল্পনার পাণ্ডবদের নিধন করে চলেছে এক এক করে, মহাকাব্যেরই বর্ণিত যোদ্ধাদের বধ করার ছলে। মৃত ব্যক্তিকে তাই কখনো ভীষ্মের শরাসনে দেখা যায়, কখনো দেখা যায় উড়ুভঙ্গ চেহারায়, তো কখনো শরীরটা ফেলা থাকে জরাসন্ধ বধের অবস্থায়! সঙ্গে দেওয়ালে দুটি ছবি আটকানো থাকে। একটির বিষয় – মহাকাব্যে বর্ণিত চরিত্রটির যাকে উদ্দেশ্য করে খুনটা, আর অন্যটি – এখনকার যুধিষ্ঠির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এক আপাতদৃষ্ট সত্যবাদী নেতা ও তার বক্তব্যযুক্ত চিত্র। খুনের কারণ বোঝাটাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবে কি যুধিষ্ঠিরই তার শেষ লক্ষ্য? নাকি আরো কেউ আছে? খুনের সূত্রপাত দ্রৌপদী দিয়েই হল? নাকি তার আগেও কোনো খুন হয়েছে যার কোনো কিনারা হয়নি? খুনি কি এক না অনেক? এরকম হাজার প্রশ্ন আর জটিলতা ভাবিয়ে তোলে পুলিশ কর্মচারী রুকসানা আহমেদ আর যুধিষ্ঠির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নেতা পবিত্র চ্যাটার্জ্জীকে। খুনের এই মহামিছিলের রহস্যভেদ করতে হাতড়াতে হয় অতীতকে। সেখান থেকে উঠে আসে কিছু ভয়ঙ্কর সত্য। বাকিটুকু জানতে দেখতে হবে সৌমিক হালদার পরিচালিত বারো পর্বের এই টানটান উত্তেজনায় ভরা সিরিজ। যেরকম সৌমিক হালদারের পরিচালনা হয়, এরকম জটিলতায় ভরপুর কাহিনী অকারণ গতিময়তার প্রলেপে না মুড়িয়েও টানটান উত্তেজনাটা কাহিনীর শেষ অবধি রেখে যেতে পেরেছেন। এটাই তাঁর সফলতা আর নতুন পরিচালকদের মধ্যে এই জন্য এনার পরিচালনা আমার দারুন লাগে। তার সাথে আছে গল্পের নতুনত্ব। অর্ণব রায় রচিত “The Mahabharat Murders” অবলম্বনে সিজনটি প্রতিহিংসা ও লালসার গতানুগতিক নিয়মে থেকেও এক অনবদ্য মোড় ঘুরিয়ে দেয় কিছু মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষদের ও অন্তরালে থাকা ঘটনার অদ্ভুত পরিসমাপ্তি দেখিয়ে। তবে কিছু জিজ্ঞাস্য থেকেই যায় যেগুলো আপাততুচ্ছ লাগতে পারে কিন্তু কাহিনীর সম্পুর্ণতার জন্য যার সংশয়াতীত ব্যাখ্যার থাকাটা কাম্য ছিল। অভিনয়তে প্রিয়াঙ্কা সরকার মুখ্য চরিত্রে বেশ মানিয়ে গেছেন। কিন্তু পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন দেবাশিস মণ্ডল। এই ভদ্রলোক কিন্তু আমার মতে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া। চরিত্র মুখ্য হোক কি গৌণ, সে বেদনার হোক কি ক্রুরতার, সবকিছুই তিনি ফুটিয়ে তোলেন স্বচ্ছন্দ সাবলীলতায়। অন্যদিকে শাশ্বত চ্যাটার্জ্জী আর কৌশিক সেনও হালটা শক্ত করে ধরার জন্য গাম্ভীর্যটা বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়জনকে দেখছি বয়স বাড়ার সাথে সাথে গুরুগম্ভীর চরিত্রে অভিনয় করলে চেহারায় একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠিণ্য ফুটিয়ে তুলে আলাদা মাপের অভিনয় উপহার দিয়ে যাচ্ছেন দর্শকদের। আবার গুরুত্বপূর্ণ আরেক চরিত্রে শাশ্বত অসামান্য। অন্যদের মধ্যে পার্শ্বচরিত্রে ঋষভ বাসুর উপস্থিতি ও অভিনয় চোখে পড়ার মতো লেগেছে। মোটকথা, রোমাঞ্চ ও নাটকীয়তায় ভরা কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি জমাটি সিরিজটি অবশ্যই দেখার দাবী রাখে।
Saturday, June 18, 2022
Saturday, December 4, 2021
মন্দার.....অসাধারনের মাঝে সাধারন
যেটা হওয়ার কথা ছিল অনন্যসাধারণ, সেটা সাধারণ আর অসাধারণের মাঝে ঝুলে রইল। কিন্তু এরকম তো হওয়ার ছিল না। সমস্ত উপাদান তো মজুত ছিল। কিন্তু মন তো ভরল না পুরো। কোথায় যেন গণ্ডগোল থেকে গেল। অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালক বলে কি প্রত্যাশাটা খুব বেড়ে গেছিল? ব্যাপারটা কি অন্যরকম কিছু হবে ভেবেছিলাম? খানিকটা যে তাই তা বলাই বাহুল্য। অভিনেতা অনির্বাণের প্রথম পরিচালনা দেখার আগ্রহ যথেষ্ট ছিল। তাহলে তো আগে দেখতে হয় পরিচালক অনির্বাণ কি করেছেন।
পুরোটা সংক্ষেপে বোঝাতে হলে বলতে হবে মাৎ করে দিয়েছেন। প্রেক্ষাপট নির্বাচন, চরিত্র নির্বাচন, ভাষার নির্বাচন - এগুলো তো বটেই কিন্তু এদের মধ্যে সাযুজ্য বজায় রাখার সামগ্রিক নিষ্ঠা সমসাময়িক যুগের বিচারে অতুলনীয়। অভিনেতাদের নিজস্ব অভিনয় ক্ষমতা সম্বন্ধে কোনোরকম মন্তব্য না করেও চয়ন দেখে যেন মনে হয় তাঁদের জন্যই চরিত্রগুলো গড়া। চিত্রায়ণে সৌমিক হালদার এক অনন্য মাত্রা দিয়েছেন সমস্ত উপস্থাপনাটিকে। কাহিনীর প্লট অনুযায়ী ড্রোন শট হোক কি চেহারার ক্লোজ আপ, প্রায় প্রত্যেকটি শট নির্ভুলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে মানবজাতির কদর্য বাস্তব। হিংসার তাড়না, প্রতিহিংসার উল্লাস, লালসার বিভৎসতা, মানসিক বিকৃতি, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রবৃত্তির বর্বর রূপ ও ঘটনার রূপকারদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশকে নির্ভুল অথচ শিল্পের অনবদ্য আঙ্গিকে ধরা হয়েছে। চিত্রের ভারসাম্য বজায় রেখে সমকৃতিত্ব দাবী করে সোমনাথ কুণ্ডুর সাজসজ্জা বিভাগ।
ম্যাকবেথ অবলম্বনে তৈরি মন্দারের পটভূমি গেইলপুর নামক এক সৈকত নগর। সেখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশ মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ভুক্ত। গোষ্ঠীর ব্যাবসার দিকটা চলে তাদের সর্দার ডাবলুভাইএর (কিং ডানকান) নেতৃত্বে। কঠিন হাতে কর্তৃত্ব জারি রাখতে খুন-জখম-ত্রাসসঞ্চার করার অন্ধকার দিকটা দেখার জন্য তার ভরসার লোক মন্দার (ম্যাকবেথ) ও বঙ্কা (ব্যাঙ্কো)। ক্রুরতা ও রহস্যে ঘেরা কিছু ঘটনার স্রোত এদের তিনজনের মনে আশঙ্কা-সন্দেহ-লালসার বীজ বপন করে দিল। তারপর শুরু হলো ক্ষমতা কায়েম ও প্রতিহিংসার এক রক্তাক্ত অধ্যায়। অবিশ্বাস ও স্বার্থপরতার এক অন্ধকার লড়াইয়ে প্রাণের মূল্য হয়ে গেল গৌণ। ভাগ্যের পরিহাসে রাজার আসন দখলের আকাঙ্খায় বন্ধু হয়ে পড়ল শত্রু, শক্তির মত্ততায় পরমাত্মীয় হেলায় নেমে গেল ব্যাভিচারের অতলে। লালসার এই ঘৃণ্য আসর ম্যাকবেথের পঞ্চ অঙ্কের মতোই পাঁচ পর্বে সমাপ্ত। শেক্সপিয়রের অনুপ্রেরণায় রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়, প্রতীক দত্ত ও পরিচালকের নিজের কলমের ফসল এই কাহিনীর গতিময়তা ও শ্বাসরোধকারী মুহুর্তগুলো প্রতীকবাবুর ঠাসবুনট চিত্রনাট্যে প্রায় অধিকাংশক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছে এক ভয়াল বাস্তবের প্রতিবিম্ব।
অভিনয়তে মুখ্য চরিত্র বাদ দিয়েও পার্শ্বচরিত্রে লোকনাথ দে (মদন) ও শঙ্কর দেবনাথ (বঙ্কা) অসাধারন। সোহিনী সরকারও (লাইলি) একাধারে অসহায়, আবার পরক্ষণেই নির্মম চরিত্রে কঠিন ও সুন্দর। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে দেবেশ রায়চৌধুরী (ডাবলুভাই) ও দেবাশিস মণ্ডল (মন্দার) দুই মুখ্য ভূমিকায় অনবদ্য। চরিত্রদের সাথে একাত্ম হয়ে পড়া এই দুজনের অভিনয় মান নিয়ে যে কোনো প্রকারের তারিফই কম শুনতে লাগবে। বিপরীতে অনির্বাণ (মুকদ্দর মুখার্জি) নিজে প্রয়োজনের অধিক মৃয়মান।
এবার তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এতকিছুর পর সমস্যার কথাটা উল্লেখ করলাম কেন? করলাম তিনটি প্রধান কারণে যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ঠিক লাগেনি। প্রথমত, চরিত্রদের নীচ মনোবৃত্তি বোঝানোর জন্য অশ্লীলতা পরিবেশনার মধ্যে যদি কিছুটা অন্যরকম কিছু করে দেখানো যেতো তাহলে বলতাম যে নতুন কিছু দেখলাম। সেখানে নতুন দেখলাম বটে, তবে তা শিল্পগুণে অত্যন্ত সাধারণ বললেও অত্যুক্তি হবে। দ্বিতীয়ত, সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি ওয়েব সিরিজ। তাহলে নাটকীয়তার আধিক্য থাকাটা অনুচিত। থাকলে সেটা বেশ অস্বস্তিকর লাগে। মন্দারের মশারী জড়িয়ে জালে পড়ে যাওয়া প্রভৃতি দৃশ্য শিল্প হিসেবে উচ্চ মানের হতেই পারে, কিন্তু এরকম কিছু নাটকীয়তার প্রাবল্য ছোটোপর্দার দৃশ্য হিসেবে বিসদৃশ্য ও দৃশ্যের ধারাবাহিকতাকে হঠাৎ করে যেন অকারণ অস্বাভাবিকতার প্রলেপ দিয়ে দৃশ্যের মান সাধারন করে দিয়েছে। তৃতীয় হচ্ছে বিষয়। কয়েকটি চলচ্চিত্রের উল্লেখ করে জিনিসটা বোঝানোর চেষ্টা করব। একটি হলিউডি, দুটি বলিউডি ও দুটি টলিউডি। শেক্সপীয়রের 'ম্যাকবেথ' অনুসরণে বিশাল ভরদ্বাজের 'মকবুল', 'জুলিয়াস সিজার' ও 'অ্যাণ্টনি অ্যাণ্ড ক্লিওপেট্রা' অবলম্বনে সৃজিত মুখার্জির জুলফিকর (অনির্বাণ যার কিছু ঝলক ব্যবহার করেছেন প্রায় সমান্তরাল এক পরিস্থিতিতে), 'হ্যামলেট' অনুসরণে অঞ্জন দত্তের 'হেমন্ত', 'ওথেলো' অবলম্বনে বিশাল ভরদ্বাজের 'ওমকারা' ও টিম ব্লেক নেলসনের 'ও'। আশ্চর্যভাবে অঞ্জন দত্তেরটা বাদ দিয়ে বাকি তিনটি ভারতীয় সংস্করণ সমাজবিরোহীদের অন্ধকার জগতের প্রেক্ষাপটে রচিত। কিন্তু এই প্রলোভনের হাতছানি এড়িয়ে বেশ অদ্ভুতভাবে নেলসন নির্মিত আধুনিক ওথেলো মানুষের অন্ধকার দিকটা দেখিয়েছেন আপাত শিক্ষিত সমাজের প্রেক্ষিতে এবং তাই হয়ে উঠেছে মৌলিকতায় ভাস্বর। অঞ্জন দত্ত চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাঁরটাও প্রতিশোধের প্রেক্ষিতে প্রায়ান্ধকার পরিবেশে পর্যবসিত। তবে কি হলিউড শুধু শিখিয়েই যাবে আর আমরা শিখেই যাব? হিংসা-প্রতিশোধ মানেই যে অন্ধকার জগত নয় সেটা কবে বুঝব? আইনের হাত এড়িয়ে অন্যায়ের শাস্তি বোধহয় শেক্সপীয়র চাননি। 'ম্যাকবেথ' পড়া থাকলে ও 'মকবুল' দেখা থাকলে 'মন্দার'-এ নতুন কিছু নেই। এখানেই খেদ! সমকালীন যুগে অনির্বাণ এক আলাদা মাপের অভিনেতা। সেকারণে তাঁর থেকে পরিচালনাটা আরো মৌলিক চেয়েছিলাম। পেলাম না, তবে অপেক্ষা করব ভবিষ্যতের চাকার মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য।
Thursday, November 18, 2021
অদ্বিতীয় ব্যোমকেশ
হইচইয়ে এই মাসে সৌমিক হালদার পরিচালিত ব্যোমকেশ ওয়েব সিরিজের সপ্তম সিজন প্রদর্শিত হল। খুব আগ্রহ সহকারে দেখলাম। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় রচিত চোরাবালি গল্প অবলম্বনে সৌগত বসুর গতিময় চিত্রনাট্য শৌভিক বসুর নিপুণ চিত্রায়নে এক শৈল্পিক আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় ব্যোমকেশের চরিত্রে। অজিতের চরিত্রে সুপ্রভাত দাস সাথে সাথে চতুর্থ সিজন থেকে সুব্রত দত্তের পরিবর্ত হিসেবে কাজ করছেন কিন্তু দুজনেই চরিত্রটির স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত আশ্চর্যভাবে সমরূপে ধরে রেখেছেন যা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবী করে। বিপরীতে সত্যবতী চরিত্রে রিদ্ধিমা ঘোষ যোগ্য সঙ্গত রেখেছেন মুখ্য ব্যক্তিত্বের সাথে। পার্শ্বচরিত্রগুলির মধ্যে অর্জুন চক্রবর্তী বোধহয় হিমাংশু চরিত্রের শিকারী সত্ত্বার সাথে অতিমাত্রায় একাত্ম হতে গিয়ে খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে পড়েছেন আর কিঞ্জল নন্দ হিমাংশুর বন্ধু কুমার ত্রিদিবের বন্ধুবৎসল জমিদারী ব্যক্তিত্বের সাথে মিশে থেকেও মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। তবে দেওয়ান কালিগতির ভূমিকায় চন্দন সেন অনবদ্য। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে স্বীকার করতেই হবে এবারের পরিবেশনাটিও বাকিগুলির মতোই আকর্ষণীয় এবং তাদের মতোই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের ছাপ রেখে পরিণতবয়স্কদের প্রসঙ্গ অবতারণা করলেও পরিচ্ছন্ন।
সমস্যা হচ্ছে পরিমিতি বোধটা অধিকাংশ জায়গায় থাকলেও পুরোপুরি থাকেনি। গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রের মধ্যে আমার কাছে ব্যোমকেশ উপরের সারিতে থাকবে। তাই তাকে নিয়ে বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেখলে ঠিক মনে হয় না। সায়ন্তন ঘোষাল পরিচালিত প্রথম সিজনে দুটি গল্পকে সমান্তরালে পরিবেশন করা হয়েছিল। সত্যান্বেষীর সাথে পথের কাঁটা, অর্থমনর্থমের সাথে মাকড়সার রস, বিষয় অথবা চরিত্রদের সামঞ্জস্য ব্যবহার করে একসাথে দুটি প্লটকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এক অভিনবত্বের সুচনা করেছিলেন পরিচালক। ভালো লেগেছিল। একই ভাবনার ব্যবহার পঞ্চম সিজনে দেখা গেছিল। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এই সিজনেরই পরিচালক। বাঙলার কুখ্যাত মন্বন্তরের পরিপ্রেক্ষিতে দুষ্টচক্র ও খুঁজি খুঁজি নারি উপস্থাপনা করা হয়েছিল। এবারের দুটি পর্বের মতোই সেবারও পর্বের সংখ্যা ছিল এক জোড়া। ষষ্ঠ সিজনে পেলাম মগ্ন মৈনাক যা আমার মতে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পঞ্চম সিজন থেকেই ব্যোমকেশের মধ্যে সমাজের অসহায়তার প্রতি একটা রাগ-দুঃখ-অভিমান পরিস্ফুট হতে দেখা গেল যা শুধুমাত্র তার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, অন্যের সাথে কথাবার্তায় বেরিয়ে পড়তে লাগল, আর বেরোতে লাগল তার কাব্যিক সত্ত্বা। ব্যোমকেশ যেন আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু সেটার জন্য এই অতিনাটকীয়তার পরিবেশ অপ্রয়োজনীয়। কারণ ব্যোমকেশের গোয়েন্দাদের আবশ্যিক শর্তের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি বিশ্লেষণ ক্ষমতাও তীব্র। কিন্তু এসবের উপর অসাধারন দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তার অন্যান্য গোয়েন্দাদের থেকে স্বতন্ত্র থাকার প্রধান কারণ তার সত্যের অনুসন্ধানের প্রতি একনিষ্ঠতা। তার আবেগ হচ্ছে সত্যকে জানার আবেগ, এতেই তার প্রধান সন্তুষ্টি, এটাই তার আসক্তি, সত্যকে জানার লক্ষে সে অবিচল। সে অবশ্যই সংসারী হতে পারে, পারিপার্শ্বিকতার অসহায়তা তার মনকে করুণ করতেই পারে। কিন্তু আমার মতে, সে এগুলোর প্রকাশ কারুর সমক্ষে করবে না। তার কষ্ট, বেদনা হবে তার একান্ত আপনার। যা অজিতের সাহিত্যিক মনকে সহজে নাড়া দিতে পারবে বা সত্যবতীর নারীহৃদয়কে সহজেই স্পর্শ করবে, সেই একই ব্যাপার ব্যোমকেশের যুক্তিবাদী মনকে তার মূলে অনুসন্ধান করতে প্ররোচিত করবে আর যদি সে বুঝতে পারে যেই সমস্যার সমাধানে তার অসহায়তা, সে অস্থির হবে, কিন্তু সে থাকবে নিরব কারণ বৃথা আলোচনার দ্বারা যে কিছু হওয়ার নয় সেটা অন্যেরা না বুঝলেও সে অবশ্যই বোঝে। সমাজের তথা সামাজিক জীবের মনস্তত্ত্ব যার নখদর্পণে, সেই হবে অজিত ও সত্যবতীর মানসিক সহায় কারণ উপযুক্ত শ্রোতা যদি ধৈর্য সহকারে অসহায়তার মনস্তত্ত্ব বুঝতে আগ্রহী হয় তাহলে তার থেকে বিচক্ষণ শিক্ষকের জুড়ি মেলা ভার। সংসারী ব্যোমকেশের সাংসারিক জীবনে সাহিত্যের বাহ্যিক প্রকাশের জন্য অজিত উপস্থিত, আছে সত্যবতীর মতো বুদ্ধিমতি শিক্ষানুরাগী স্ত্রী, কিন্তু সত্যান্বষণের পথে নিবেদিত হৃদয়, ব্যোমকেশের প্রাণে সাহিত্য সঞ্চার প্রয়োজন না থাকলে অনভিপ্রেত।
এত কথা বলছি এই কারণেই যে এই সিরিজগুলি পরিবেশনায় অন্যান্য অনেক ব্যোমকেশের চিত্রায়িত উপস্থাপনার থেকে শুধুমাত্র তার পরিমিতি বোধের কারণে আকর্ষণীয় এবং স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল। সিজনগুলির পরিচালকদের মধ্যে উল্লেখিত দুজন ছাড়াও সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ও একই ধারা বজায় রেখেছেন যা অবশ্যই আন্তরিক অভিনন্দনের অধিকারী। তাই সবার থেকে আলাদা বহু প্রতিক্ষিত এই সিজনগুলির এই ত্রুটিটুকু না থাকলে সিরিজটি সর্বতোভাবে সুন্দর হতে পারবে।
সপ্তম সিজনে ফিরে এসে দুটো সমস্যার উপর আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত, শরদিন্দু বর্ণিত হিমাংশু প্রকৃতিতে উদার ছিলেন। তাকে অমলিন করে দিয়ে খুব কি লাভ হলো? উপরন্তু তার প্রতি ব্যোমকেশ নির্ধারিত শাস্তির মাত্রা বিচারককে তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিকারপ্রিয় হিমাংশুকে যদি সর্বক্ষণ শিকারীর পোষাকে দেখা যায়, সেটাও দৃষ্টিকটু লাগে!
এই মুহুর্তে অপ্রাসঙ্গিক লাগলেও আরেকটি ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাঙলা রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্যে শরদিন্দু ও সত্যজিৎ দুই বলিষ্ঠ রূপকার। শরদিন্দুর সৃষ্ট ব্যোমকেশ ও সত্যজিতের কল্পনার ফেলুদা অমর হয়ে আছে তাদের নিজস্বতায়। এই সিজনের একটি দৃশ্যে ছোট্ট বেবির সাথে ব্যোমকেশের পরিচয় এবং আলাপ জয় বাবা ফেলুনাথে চিত্রায়িত ফেলুদার সাথে রুকুর পরিচয়পর্ব স্মরণ করায়। দৃশ্যটির অবতারণা অনাবশ্যক এবং পরবর্তী পর্যায়ে রায়পরিবার নিয়ে আলোচনা ভীষন ভাবে কৃত্রিম। শরদিন্দু আর সত্যজিত যে যার আপন সৃষ্টির মধ্যেই উজ্জ্বল। তাদের সেরকমভাবে মনে রাখাই শ্রেয়।