Sunday, July 2, 2023
Homestay Murders: খুনির সাথে, খুনের মাঝে, একই বাড়িতে
Thursday, January 13, 2022
গোরা....কাণ্ড
বাঙালী দর্শকমাত্রেই গোয়েন্দা গল্পের পোকা! আর রহস্য রোমাঞ্চ ধারাবাহিক হলে তো কথাই নেই, টি আর পি এমনি এমনি বেড়ে যাবে। জানা কথা যে গল্পের শেষে গোয়েন্দা ঠিক অপরাধী ধরে ফেলবে। তবুও গোয়েন্দা গল্প এক অমোঘ আকর্ষণ বাঙালী দর্শকমাত্রে। বলতে কি, অনেকটা এই কারণেই আমার গোরা দেখার সূত্রপাত। আরো একটা কারণ অবশ্য ছিল, তবে গৌণ - ঋত্বিক। এই ভদ্রলোকের অভিনয় আমার বেশ লাগে এবং গোয়েন্দা চরিত্রে তিনি কি করেন সেটা দেখার আলাদা করে বাসনা ছিল। এর আগে ব্যোমকেশের বন্ধু হিসেবে অজিতের চরিত্রে দেখেছি। এবার গোয়েন্দা হিসেবে কেমন দেখব ভাবছিলাম। তবে মুলতঃ গোয়েন্দা কাহিনীর টানেই কিন্তু সিরিজটা দেখতে শুরু করি।
কিন্তু প্রথম পর্বে দৃশ্যে পদার্পণ মাত্রেই এবং পর্বটা খতম হওয়ার আগেই আমার গৌণ উদ্দেশ্যটাই আসল হয়ে গেল এবং সিজনটি শেষ হবার আগেই ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনীত গোরা চরিত্রটি এতটাই আমার কাছে প্রাধাণ্য পেয়ে গেল যে, গল্পে যদি গরুকে গাছে চড়ানো দেখানোও হত, আমি তবুও বসে বসে তাই দেখতাম। এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় আমি শেষ কার থেকে কবে দেখেছি জানি না। বেসুরো গান পাগলা, সাঙ্ঘাতিক খ্যাপাটে, প্রচন্ড ভুলো, নাম পর্যন্ত মনে না রাখতে পারা, জগতের যাবতীয় স্বাভাবিকতা সম্বন্ধে উদাসীন, কিন্তু তীব্র নজর আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী শক্তির অধিকারী গোয়েন্দা চরিত্রে ঋত্বিক গোড়াতেই ফাটাফাটি। অবশ্য সত্যি করে বললে কিন্তু ফাটাফাটিটা আমি ঋত্বিককে বললাম না গোরা চরিত্রটাকে বললাম সেটা ঠিক বলতে পারবো না। কারণ গোরা চরিত্রটার মধ্যে ঋত্বিক এমন করে মিশে গেছেন যে আলাদা করতে অন্য গোয়েন্দা লাগবে! সত্যি বলছি গল্পটায় এমন কিছু নেই যাতে একে রুদ্ধশ্বাস প্লট বলা যায়, উপরন্তু বেশ কয়েকটি জায়গায় বালকসুলভ গণ্ডগোল আর অতি সরলীকরণ আছে যেটা গোয়েন্দা গল্পে বেশ দৃষ্টিকটু। কিন্তু তাও বলছি, পর্বগুলি ঋত্বিকের অভিনয় আর প্লটের স্বচ্ছন্দ গতির দৌলতে যেন এক টুকরো মুক্ত বাতাস উপহার দিয়েছে আমাদের। গোয়েন্দা গল্পে হাস্যরসের সঠিক মিশ্রণ আজকাল বেশি দেখতে পাওয়া যায় না। কোথাও অস্বাভাবিক রকমের অতিরিক্ত হয়ে যায় তো কোথাও একদমই অনুপস্থিত থাকে। এখানে মজা আছে তো বটেই, যেখানগুলো অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারত সেই জায়গাগুলোতেও পরিচালনা ও অভিনয়ের অসামান্যতায় হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। মজার মোড়কে পরিবেশিত সাহানা দত্তের কাহিনীর রহস্য তার গাম্ভীর্য তো হারায়নি, বরং হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও সজীব। যেরকম তিনি দুটি গল্পকে মিশিয়ে ব্যোমকেশ সিরিজ তৈরি করেছিলেন, তেমনি সায়ন্তন ঘোষাল এখানেও দুটি গল্পকে একটি কাহিনীর মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আবার গোরাকে প্রশাসন যদিও ধারাবাহিক খুন বিশেষজ্ঞ বলে অভিহিত করেছে, কিন্তু অন্যান্য অপরাধ সম্বন্ধেও গোরা সমান ওয়াকিবহাল। একারণে সে যদিও লেখকদের রহস্যময় খুনের তদন্তে সিরিয়াল কিলার ধরতে পুলিশকে সাহায্য করতে তৈরি, কিন্তু যখন এক গৃহবধূ তার স্লিপওয়াকিং নিয়ে এক অস্বাভাবিক ঘটনার উত্থাপন করে, সমস্যাটা তার কৌতুহল উদ্রেক করে। তবে এই কেসে সে অকুস্থলে যাওয়ার তাগিদ দেখায় না কিন্তু সমাধানের উপায় বাতলে দেয়। রহস্যে ভরা পরিবেশকে আরো চিত্তাকর্ষক করেছে অয়ন ভট্টাচার্য ও বিনীত রঞ্জন মৈত্রর ধ্বনির ও সুরের জমকালো ভারসাম্য। গোরার খামখেয়ালের সাথে তাল রেখে একাধারে তার বন্ধু, সহকারি আবার হবু ভগ্নীপতির চরিত্রে সুহোত্র মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। বহুদিন বাদে গোয়েন্দা চরিত্রটির সাথে সমান তালে পাল্লা দেওয়া এক শাগরেদ চরিত্র পেলাম যে বন্ধুর পিছনে লাগা আর দরকার বা অদরকারে পাশে থাকতে সমান উৎসাহী। ঈশা সাহার চরিত্রটিতে চমকের একটা নতুনত্ব আছে তবে অভিনয়তে বিশেষ কিছু করার নেই। তবে পরবর্তী সিজনে যে তিনি বেশি কিছু করার সুযোগ পাবেন তার ইঙ্গিত যেমন আছে তেমনি সেখানে ঋত্বিকের পাশে দাপটের সাথে যে তিনি অভিনয় করবেন, তারও যথেষ্ট আভাস আছে।
তাই সময় নষ্ট না করে গায়কিতে ক্যাকোফনিক্স, দেমাকে পোয়ারো, রূপে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাগলা জগাই আর খামখেয়ালে একদম নিজস্ব, ভুলোমনা গোরার সিরিজটি দেখুন ও কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান বিচিত্র কিছু রহস্যের খাসমহলে!
Thursday, November 18, 2021
অদ্বিতীয় ব্যোমকেশ
হইচইয়ে এই মাসে সৌমিক হালদার পরিচালিত ব্যোমকেশ ওয়েব সিরিজের সপ্তম সিজন প্রদর্শিত হল। খুব আগ্রহ সহকারে দেখলাম। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় রচিত চোরাবালি গল্প অবলম্বনে সৌগত বসুর গতিময় চিত্রনাট্য শৌভিক বসুর নিপুণ চিত্রায়নে এক শৈল্পিক আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় ব্যোমকেশের চরিত্রে। অজিতের চরিত্রে সুপ্রভাত দাস সাথে সাথে চতুর্থ সিজন থেকে সুব্রত দত্তের পরিবর্ত হিসেবে কাজ করছেন কিন্তু দুজনেই চরিত্রটির স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত আশ্চর্যভাবে সমরূপে ধরে রেখেছেন যা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবী করে। বিপরীতে সত্যবতী চরিত্রে রিদ্ধিমা ঘোষ যোগ্য সঙ্গত রেখেছেন মুখ্য ব্যক্তিত্বের সাথে। পার্শ্বচরিত্রগুলির মধ্যে অর্জুন চক্রবর্তী বোধহয় হিমাংশু চরিত্রের শিকারী সত্ত্বার সাথে অতিমাত্রায় একাত্ম হতে গিয়ে খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে পড়েছেন আর কিঞ্জল নন্দ হিমাংশুর বন্ধু কুমার ত্রিদিবের বন্ধুবৎসল জমিদারী ব্যক্তিত্বের সাথে মিশে থেকেও মাত্রাতিরিক্ত গম্ভীর। তবে দেওয়ান কালিগতির ভূমিকায় চন্দন সেন অনবদ্য। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে স্বীকার করতেই হবে এবারের পরিবেশনাটিও বাকিগুলির মতোই আকর্ষণীয় এবং তাদের মতোই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের ছাপ রেখে পরিণতবয়স্কদের প্রসঙ্গ অবতারণা করলেও পরিচ্ছন্ন।
সমস্যা হচ্ছে পরিমিতি বোধটা অধিকাংশ জায়গায় থাকলেও পুরোপুরি থাকেনি। গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রের মধ্যে আমার কাছে ব্যোমকেশ উপরের সারিতে থাকবে। তাই তাকে নিয়ে বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেখলে ঠিক মনে হয় না। সায়ন্তন ঘোষাল পরিচালিত প্রথম সিজনে দুটি গল্পকে সমান্তরালে পরিবেশন করা হয়েছিল। সত্যান্বেষীর সাথে পথের কাঁটা, অর্থমনর্থমের সাথে মাকড়সার রস, বিষয় অথবা চরিত্রদের সামঞ্জস্য ব্যবহার করে একসাথে দুটি প্লটকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এক অভিনবত্বের সুচনা করেছিলেন পরিচালক। ভালো লেগেছিল। একই ভাবনার ব্যবহার পঞ্চম সিজনে দেখা গেছিল। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এই সিজনেরই পরিচালক। বাঙলার কুখ্যাত মন্বন্তরের পরিপ্রেক্ষিতে দুষ্টচক্র ও খুঁজি খুঁজি নারি উপস্থাপনা করা হয়েছিল। এবারের দুটি পর্বের মতোই সেবারও পর্বের সংখ্যা ছিল এক জোড়া। ষষ্ঠ সিজনে পেলাম মগ্ন মৈনাক যা আমার মতে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পঞ্চম সিজন থেকেই ব্যোমকেশের মধ্যে সমাজের অসহায়তার প্রতি একটা রাগ-দুঃখ-অভিমান পরিস্ফুট হতে দেখা গেল যা শুধুমাত্র তার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, অন্যের সাথে কথাবার্তায় বেরিয়ে পড়তে লাগল, আর বেরোতে লাগল তার কাব্যিক সত্ত্বা। ব্যোমকেশ যেন আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু সেটার জন্য এই অতিনাটকীয়তার পরিবেশ অপ্রয়োজনীয়। কারণ ব্যোমকেশের গোয়েন্দাদের আবশ্যিক শর্তের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি বিশ্লেষণ ক্ষমতাও তীব্র। কিন্তু এসবের উপর অসাধারন দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তার অন্যান্য গোয়েন্দাদের থেকে স্বতন্ত্র থাকার প্রধান কারণ তার সত্যের অনুসন্ধানের প্রতি একনিষ্ঠতা। তার আবেগ হচ্ছে সত্যকে জানার আবেগ, এতেই তার প্রধান সন্তুষ্টি, এটাই তার আসক্তি, সত্যকে জানার লক্ষে সে অবিচল। সে অবশ্যই সংসারী হতে পারে, পারিপার্শ্বিকতার অসহায়তা তার মনকে করুণ করতেই পারে। কিন্তু আমার মতে, সে এগুলোর প্রকাশ কারুর সমক্ষে করবে না। তার কষ্ট, বেদনা হবে তার একান্ত আপনার। যা অজিতের সাহিত্যিক মনকে সহজে নাড়া দিতে পারবে বা সত্যবতীর নারীহৃদয়কে সহজেই স্পর্শ করবে, সেই একই ব্যাপার ব্যোমকেশের যুক্তিবাদী মনকে তার মূলে অনুসন্ধান করতে প্ররোচিত করবে আর যদি সে বুঝতে পারে যেই সমস্যার সমাধানে তার অসহায়তা, সে অস্থির হবে, কিন্তু সে থাকবে নিরব কারণ বৃথা আলোচনার দ্বারা যে কিছু হওয়ার নয় সেটা অন্যেরা না বুঝলেও সে অবশ্যই বোঝে। সমাজের তথা সামাজিক জীবের মনস্তত্ত্ব যার নখদর্পণে, সেই হবে অজিত ও সত্যবতীর মানসিক সহায় কারণ উপযুক্ত শ্রোতা যদি ধৈর্য সহকারে অসহায়তার মনস্তত্ত্ব বুঝতে আগ্রহী হয় তাহলে তার থেকে বিচক্ষণ শিক্ষকের জুড়ি মেলা ভার। সংসারী ব্যোমকেশের সাংসারিক জীবনে সাহিত্যের বাহ্যিক প্রকাশের জন্য অজিত উপস্থিত, আছে সত্যবতীর মতো বুদ্ধিমতি শিক্ষানুরাগী স্ত্রী, কিন্তু সত্যান্বষণের পথে নিবেদিত হৃদয়, ব্যোমকেশের প্রাণে সাহিত্য সঞ্চার প্রয়োজন না থাকলে অনভিপ্রেত।
এত কথা বলছি এই কারণেই যে এই সিরিজগুলি পরিবেশনায় অন্যান্য অনেক ব্যোমকেশের চিত্রায়িত উপস্থাপনার থেকে শুধুমাত্র তার পরিমিতি বোধের কারণে আকর্ষণীয় এবং স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল। সিজনগুলির পরিচালকদের মধ্যে উল্লেখিত দুজন ছাড়াও সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ও একই ধারা বজায় রেখেছেন যা অবশ্যই আন্তরিক অভিনন্দনের অধিকারী। তাই সবার থেকে আলাদা বহু প্রতিক্ষিত এই সিজনগুলির এই ত্রুটিটুকু না থাকলে সিরিজটি সর্বতোভাবে সুন্দর হতে পারবে।
সপ্তম সিজনে ফিরে এসে দুটো সমস্যার উপর আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত, শরদিন্দু বর্ণিত হিমাংশু প্রকৃতিতে উদার ছিলেন। তাকে অমলিন করে দিয়ে খুব কি লাভ হলো? উপরন্তু তার প্রতি ব্যোমকেশ নির্ধারিত শাস্তির মাত্রা বিচারককে তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিকারপ্রিয় হিমাংশুকে যদি সর্বক্ষণ শিকারীর পোষাকে দেখা যায়, সেটাও দৃষ্টিকটু লাগে!
এই মুহুর্তে অপ্রাসঙ্গিক লাগলেও আরেকটি ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাঙলা রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্যে শরদিন্দু ও সত্যজিৎ দুই বলিষ্ঠ রূপকার। শরদিন্দুর সৃষ্ট ব্যোমকেশ ও সত্যজিতের কল্পনার ফেলুদা অমর হয়ে আছে তাদের নিজস্বতায়। এই সিজনের একটি দৃশ্যে ছোট্ট বেবির সাথে ব্যোমকেশের পরিচয় এবং আলাপ জয় বাবা ফেলুনাথে চিত্রায়িত ফেলুদার সাথে রুকুর পরিচয়পর্ব স্মরণ করায়। দৃশ্যটির অবতারণা অনাবশ্যক এবং পরবর্তী পর্যায়ে রায়পরিবার নিয়ে আলোচনা ভীষন ভাবে কৃত্রিম। শরদিন্দু আর সত্যজিত যে যার আপন সৃষ্টির মধ্যেই উজ্জ্বল। তাদের সেরকমভাবে মনে রাখাই শ্রেয়।