Showing posts with label comic. Show all posts
Showing posts with label comic. Show all posts

Thursday, April 30, 2026

ঠাকুমার ঝুলি: রহস্যের অলিগলি

শ্রাবন্তী এবার গোয়েন্দা চরিত্রে!

ঠাকুমাও বটে!

ঝুলি থেকে তো বেড়াল বেরোয়।


কিন্তু এই ঠাকুমার অন্য ঝুলি..... ঝুলি তো নয়, যেন বুদ্ধির ঝাঁপি!

তবে শুরুটা হয়েছিল বেড়াল দিয়েই।

হয়েছে কি, ঠাকুমা তো বিয়েবাড়ি গেছেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। নাতনীর বন্ধুর বিয়ে। কনে বিলেত ফেরত, নাতনীও তাই! কনে বিষ্ণুপুরের নামকরা চৌধুরীবাড়ির মেয়ে। কিন্তু বিয়েবাড়িতেই কনে খুন!

অবশ্য খুনটা কেউ বোঝেনি! শুধু ঠাকুমা পোস্টমর্টেমটা করতে বলল বলেই তো জানাটা গেল, অবশ্য কনের মায়েরও সায় ছিল! কিন্তু এই করেই তো ঠাকুমা বিপদটা ঘরে ডেকে আনলেন। আরেকটা খুন হলো!

হরি! ঠাকুমার বেড়াল। বেলা আর ফণ্টের মা! পোষ্যদের নাম রাখার ধরনেই স্পষ্ট যে এই ঠাকুমা যে সে ঠাকুমা নন। প্রিয় গায়ক, হ্যারি বেলাফন্তের নাম ভেঙে বিড়ালদের নাম! কে রাখে? গিরিজাবালা দেবী, মানে আমাদের ঠাকুমা রাখেন!

কিন্তু নামের কথা পরে হবে! এবার খুনের কথায় আসি!

ঠাকুমা তো খুন সন্দেহ করলেন বিয়েবাড়ির কাণ্ড দেখে। এদিকে খুনি গেল ঘাবড়ে। সে তখন ঠাকুমার আদরের হরিকে খুন করিয়ে তার মৃতদেহের সাথে একটা হুমকি চিরকুট পাঠাল। কিন্তু এইখানেতেই তার হয়ে গেল মস্ত ভুল।

সম্মুখ সমরে নেমে পড়লেন ঠাকুমা। অবশ্য ঠাকুমাই সম্মুখে, খুনি আড়ালে! কিন্তু ঠাকুমার যা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, খুনি আর কতক্ষণ আড়ালে থাকবে? নিজের শ্বাশুড়ির কাছ থেকে গিরিজাবালা পেয়েছিলেন গোয়েন্দা সার্টিফিকেট, আর তিনি নিজে গোয়েন্দা লেখকের মা, যে ছেলে তার মায়ের আদলেই সৃষ্টি করেছিল তার গোয়েন্দা চরিত্র!

এমন মহিলাকে যে ঠকানো বেশ কঠিন! সাথে আবার অকুতোভয় নাতনী, আর তার সাথে এক ভালোমানুষ সাংবাদিক, উঠতি এবং বেশ অপেশাদার! স্থানীয় পুলিশ অফিসার তো আছেই, তবে ভরসা করার মতো নয় খুনিকে চিনে বের করতে!

এই শেষ চরিত্রটিকে নিয়ে এবার একটা কথা বলে ফেলি বরং এই ময়কায়। এই গোটা রহস্যেঘেরা ধটনাকে হালকা একটা মজার মোড়কে মুড়ে রাখার কৃতিত্বটা যেমন একাধারে সম্রাজ্ঞী বন্দোপাধ্যায়ের কলমের ও অয়ন চক্রবর্তীর পরিচালনার, ঠিক তেমনি যে কয়েকটি অভিনেতা এই মজাটাকে পুরো গল্পটাতে চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জি অভিনীত পুলিশ অফিসারের চরিত্রটি। কৌতুকে মোড়া এই অনবদ্য চরিত্রটিকে যখন দেখছিলাম, তার পরেপরেই শুনতে পেলাম যে এই ভদ্রলোককে আর নতুন কোনো চরিত্রে দেখতে পাবো না। মনটা খারাপ হয়ে গেছিল! রাহুল এই সিরিজটার মুখ্য চরিত্র না হলেও মুখ্য এক ভারসাম্য রক্ষা করে কাহিনীটিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন! এই প্রাণোচ্ছল কৌতুকের মধ্যে দিয়েই তাঁকে মনে রাখব!

কৌতুকের আরেকটি স্তম্ভ হলো দেবরাজ ভট্টাচার্য! তবে শ্রাবন্তীও অসাধারণ। এত বয়স্কার অভিনয় খুব সহজ ছিল না কিন্তু! তাই এই চেষ্টাটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, সাহসী এবং যথেষ্ট পরিণত! চরিত্রটাকে একইসঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন অভিনেত্রী! সাথে অঙ্কিতা মাঝিও সুনিপুণ বিশেষ এক চরিত্রে আর দিব্যাণী মণ্ডলকেও মানিয়ে গিয়েছে ঠাকুমার নাতনি-cum-সহকারী হিসেবে। সহজ ছন্দে চলা এই কাহিনীটি তাই সকলের কাছেই লাগতে পারে বেশ উপভোগ্য!

Thursday, September 7, 2023

কুমুদিনী ভবন, হোচি সরকার ও অনেকগুলি রহস্য

কুমুদিনী ভবনে রহস্য দেখা দিয়েছে। মানে কুমুদিনী ভবন নামক মহিলাদের মেসটিতে ভীষণ সব কাণ্ড ঘটছে। বাড়িটিতে নানা বয়সের ও বিভিন্ন পরিচয়ের মহিলাদের ভাড়া দিয়ে থাকেন বাড়ির কর্ত্রী, মাসিমা। সাথে বাড়ির পরিচারিকা ও নিজের অনাথ ও অসুস্থ নাতি! মোটামুটি নিজের বাড়ির মতো ঘরোয়া করে থাকার পরিবেশ। দিনগুলো সবাই মিলে হইচই করেই কাটিয়ে দিতো। আপাত ঝামেলাহীন বাড়িটিকে কেন্দ্র করে পরপর তিনটে খুনই তাই পরিস্থিতিটা ঘোরালো করে দিলো! একসাথে তিনটে খুন - আবার ঠিক খুনের দিনটাতেই আগমন হয় এক অচেনা মহিলার - অফিসার হোচি সরকার তো চাপে পড়বেই! একে তো তিনটে খুনের জট, তার উপর তিনি আবার মৃতদেহ সহ্য করতে পারেন না, কি যে করবেন কে জানে?
অবশ্য পুরোটা যদি জানতেই হয় তবে তো দেখতেই হবে বাকি ব্যাপারগুলো। অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও উষসী রায়ের অভিনীত সিরিজটি শুধু অভিনয়ের খাতিরেই খুব উপভোগ্য। রহস্যটা জমাটও থেকেছে অর্কদীপ মল্লিকা নাথের গতিময় পরিচালনার জাদুতে। হাসিঠাট্টার মোড়কে রহস্যের উপস্থাপনা করে গোয়েন্দা কাহিনীটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।

Wednesday, July 12, 2023

গোরা 2: জমে গেল too!

গোরাতে কিন্তু no গোলমাল! মানে গলদ আছে, তবে তা নিয়ে চাপ না নিলেই তো হোলো! এই বাজারে এমন পুরোদস্তুর অদ্ভুত কিন্তু প্রায় পুরোপুরি জমাটি সিরিজ তো বেশি দেখতে পাওয়া যায় না কোথাও! এক বিদঘুটে রকমের ভুলো ব্যক্তি, যে পারলে নিজের নামটাও ভুলে যায়, সে কিনা serial killer ধরার specialist? তার উপর আবার সাংঘাতিক বদমেজাজ। তার উপর আছে গানের বাতিক। যদিও সেই গানের তেজ stengun মনে পড়িয়ে দেবে! কিন্তু কি আর করবেন বলুন, লোকটা তো এইসবের মধ্যেও গুছিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে! তাই এই চমকে দেওয়া private defective মানুষটাকে দেখা must! লোকটা আপনাকে ঠিক টেনে আনবে অদ্ভুত কিছু রহস্যের মাঝে। শুরুতে মাথাটা বেশ করে গুলিয়ে দিলেও রহস্যের জট অবশেষে ঠিক যুক্তি দেখিয়ে খুলে দেবে।
গোলমাল অবশ্য এবার শুধুমাত্র এক রহস্যেতেই সীমাবদ্ধ নেই। গুরুতর আরেক গোলমাল গোরা নিজেই এবার বাধিয়েছে। তড়িঘড়ি গোরা চেয়েছে বিয়ে করে ফেলতে! তো পাত্রীও যে হাতের কাছে নেই তা নয়! কাছাকাছির মধ্যেই তো একজন আছে। গোরার বাড়িতে তার মায়ের চোখের ছানি কাটানোর পর রাতদিন থেকে যাওয়া আয়াটি তো সম্ভাব্য পাত্রীদের মধ্যে অন্যতমা! একহাতে গোরার মাকে সেবাযত্ন করতে করতে যে গোরাকেও টাইট দিতে পারে, তাকে কি করে গোরার থেকে কোনো অংশে কম বলব?
আবার গোরার যে নতুন মক্কেলটি, তাকেও প্রার্থী হিসেবে ভাবাই যায়! তো গোরা কি করবে? বিয়ে না রহস্যভেদ! তবে গোরা যা খুশি করুক, আপনি কিন্তু দেখে ফেলুন এমন তালে তাল মেলানো সাবলীল অভিনয়ের এক অসামান্য সিরিজ। সত্যি বলছি, সিরিজটা দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, কাহিনী, প্লট, এসবের কি দরকার, যেখানে অভিনয়টাই আসল! কি ঋত্বিক চক্রবর্তী, কি সুহোত্র মুখোপাধ্যায়, কাকে ছেড়ে যে কাকে দেখব! অনবদ্য এই দুজনের তালে তাল মিলিয়ে আছে মানালি মনীষা দে, মৃদু অথচ দরকারমতো হালকা রসিকতা সরবরাহ করতে দক্ষ অভিজিত গুহ, চাপা কান্নার সাথে মাপমতো হাসি নিয়ে উষসী রায়ের ছোটো কিন্তু মজার মাঝেও লক্ষে অবিচল থাকা অনমনীয় চরিত্র।
তবে সিরিজটা দেখে যে এত আনন্দ পেলাম তার মূল কারণ বোধহয় আরো গভীরে। রহস্যের মোদ্দা ব্যাপারটা বালকসুলভ হলেও ও পরের দিকে গতি খানিকটা থমকালেও, সাহানা দত্তের মুচমুচে স্ক্রিপ্ট ও রবিরঞ্জন মৈত্রের ঝোড়ো সম্পাদনা মাতিয়ে দিয়েছে। জয়দীপ মুখার্জ্জীর পরিচালিত সিরিজটিতে তাই রহস্যের চাপটা না নিয়ে উপভোগ করতে পারলে প্রাণবন্ত অভিনয় দেখার সহজাত রেশটা মনকে খানিকক্ষণের জন্য হলেও চাপমুক্ত করে রাখবে।

Sunday, January 29, 2023

করবে কাবু একেনবাবু!

একেনবাবু কলকাতায় এলেন.... অপরাধ দেখলেন..... সমস্যার সাথে সাথে দর্শকদের মনও প্রায় জয় করে ফেলেছিলেন, কিন্তু বাদ সাধল শেষটুকু! অবশ্য এরকম কর বলাটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না, অভিযোগটা হতেই পারে একান্তই আমার ব্যক্তিগত মত। তাই আগে বরং বলে নেওয়া যাক মনকাড়া প্রসঙ্গগুলোর সম্বন্ধে।

প্রথমেই প্রশংসা করতে হয় গল্পগুলোকে সমস্ত বয়সের উপযোগী করে তোলার প্রয়াসটাকে। যেখানে বহু সিরিজ ওটিটির সেন্সরশিপের বাইরে থাকার সুবিধাটাকে হাতিয়ার করে অকারণ অকথ্য ভাষা ও কয়েকটি অস্বাভাবিক রুচির দৃশ্য ঢুকিয়ে বেকার সীমিত সংখ্যক লোকজনের দেখার জন্য পরিবেশন করছে, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক প্রসঙ্গের সম্ভাবনা দেখলেই তাকে সুচারুরূপে সমস্ত বয়সের উপযোগী করে পরিবেশন করার সাহসী এবং সংযমী প্রয়াসকে সেলাম। প্রতি কাহিনীতে ধারাবাহিকভবে ব্যাপারটাকে ধরে রাখার চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।

এরপর অভিনয়। এতদিনে অনির্বাণ চক্রবর্তী তো একেনবাবুর সাথে প্রায় সমার্থক হয়ে গেছেনই রুপোলী পর্দায়, কিন্তু এবার, সুহোত্র মুখোপাধ্যায় ও সোমক ঘোষ যথাক্রমে বাপীবাবু ও প্রমথবাবু চরিত্রদুটিকে আরো স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত করে ফুটিয়ে তুলে চক্কোত্তিবাবুকে ছাপিয়ে গেছেন! সুহোত্র ও সোমক একেনবাবু সিরিজে প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করে জমিয়ে যুগলবন্দী পরিবেশন করলেন। চরিত্রদুটিতে অভিনয় করা পূর্বতন অভিনেতাদের ছোটোপর্দায় অভিনয়কে ছোটো না করেও বলছি, নতুন এই জুটি সত্যিই অনবদ্য! অবশ্য বড়পর্দায় একেনবাবু ছবিতে এই দুজন আগে এই চরিত্রদুটি করে তারপর সিরিজে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই যেন সিরিজে দুজনে এত সাবলীল, এত মজাদার! তার সাথে শুভ্রজিৎ দত্ত ও বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী দুটি ছোটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে জমিয়ে দিয়েছেন। চরিত্রদুটি ছোটো দৈর্ঘ্যের হলেও, মূল রহস্যের গাম্ভীর্যকে এতটুকু না কমিয়েও হাসিঠাট্টা মেশানো কিছু টাটকা মুহুর্ত উপহার দিয়েছেন। তার সাথে আছেন লোকনাথ দে। ভদ্রলোককে 'মন্দার' থেকে দেখছি যে পর্দায় উপস্থিতির প্রতিটি ক্ষণকে কি এক জাদুতে অসামান্য করে তোলেন, শুধুমাত্র অভিব্যক্তি দিয়ে।

কিন্তু এত করেও সমস্যাটা তাহলে কি হল? সমস্যাটা দেখতে পেলাম গোয়েন্দার সত্ত্বাতে। অপরাধীকে ধরতে গোয়েন্দাকে হতেই হবে কঠিন, প্রয়োজনে রূঢ়, কিন্তু অপরাধীর অসহায়তাকে কি করে অস্বীকার করবে? কি করে অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়ার পরেও অসহায়তাকে নিয়ে খরচ করবে না কোনো মুহুর্ত। কাহিনীকার কি লিখে গেছেন জানি না, তবে পরিচালক হিসেবে জয়দীপ মুখার্জ্জীবাবু ভেবে দেখতে পারেন। না হলে ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরীটি তো কোন ছাড়্, গোয়েন্দা অর্জুনও অনেকটা এগিয়ে থাকবে। উচ্চমানের সত্যসন্ধানী উচ্চ মনের অধিকারী হলে তবেই হৃদয়ে থেকে যাবে।

Thursday, January 13, 2022

গোরা....কাণ্ড

বাঙালী দর্শকমাত্রেই গোয়েন্দা গল্পের পোকা! আর রহস্য রোমাঞ্চ ধারাবাহিক হলে তো কথাই নেই, টি আর পি এমনি এমনি বেড়ে যাবে। জানা কথা যে গল্পের শেষে গোয়েন্দা ঠিক অপরাধী ধরে ফেলবে। তবুও গোয়েন্দা গল্প এক অমোঘ আকর্ষণ বাঙালী দর্শকমাত্রে।  বলতে কি, অনেকটা এই কারণেই আমার গোরা দেখার সূত্রপাত। আরো একটা কারণ অবশ্য ছিল, তবে গৌণ - ঋত্বিক। এই ভদ্রলোকের অভিনয় আমার বেশ লাগে এবং গোয়েন্দা চরিত্রে তিনি কি করেন সেটা দেখার আলাদা করে বাসনা ছিল। এর আগে ব্যোমকেশের বন্ধু হিসেবে অজিতের চরিত্রে দেখেছি। এবার গোয়েন্দা হিসেবে কেমন দেখব ভাবছিলাম। তবে মুলতঃ গোয়েন্দা কাহিনীর টানেই কিন্তু সিরিজটা দেখতে শুরু করি।

কিন্তু প্রথম পর্বে দৃশ্যে পদার্পণ মাত্রেই এবং পর্বটা খতম হওয়ার আগেই আমার গৌণ উদ্দেশ্যটাই আসল হয়ে গেল এবং সিজনটি শেষ হবার আগেই ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনীত গোরা চরিত্রটি এতটাই আমার কাছে প্রাধাণ্য পেয়ে গেল যে, গল্পে যদি গরুকে গাছে চড়ানো দেখানোও হত, আমি তবুও বসে বসে তাই দেখতাম। এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় আমি শেষ কার থেকে কবে দেখেছি জানি না। বেসুরো গান পাগলা, সাঙ্ঘাতিক খ্যাপাটে, প্রচন্ড ভুলো, নাম পর্যন্ত মনে না রাখতে পারা, জগতের যাবতীয় স্বাভাবিকতা সম্বন্ধে উদাসীন, কিন্তু তীব্র নজর আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী শক্তির অধিকারী গোয়েন্দা চরিত্রে ঋত্বিক গোড়াতেই ফাটাফাটি। অবশ্য সত্যি করে বললে কিন্তু ফাটাফাটিটা আমি ঋত্বিককে বললাম না গোরা চরিত্রটাকে বললাম সেটা ঠিক বলতে পারবো না। কারণ গোরা চরিত্রটার মধ্যে ঋত্বিক এমন করে মিশে গেছেন যে আলাদা করতে অন্য গোয়েন্দা লাগবে! সত্যি বলছি গল্পটায় এমন কিছু নেই যাতে একে রুদ্ধশ্বাস প্লট বলা যায়, উপরন্তু বেশ কয়েকটি জায়গায় বালকসুলভ গণ্ডগোল আর অতি সরলীকরণ আছে যেটা গোয়েন্দা গল্পে বেশ দৃষ্টিকটু। কিন্তু তাও বলছি, পর্বগুলি ঋত্বিকের অভিনয় আর প্লটের স্বচ্ছন্দ গতির দৌলতে যেন এক টুকরো মুক্ত বাতাস উপহার দিয়েছে আমাদের। গোয়েন্দা গল্পে হাস্যরসের সঠিক মিশ্রণ আজকাল বেশি দেখতে পাওয়া যায় না। কোথাও অস্বাভাবিক রকমের অতিরিক্ত হয়ে যায় তো কোথাও একদমই অনুপস্থিত থাকে। এখানে মজা আছে তো বটেই, যেখানগুলো অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারত সেই জায়গাগুলোতেও পরিচালনা ও অভিনয়ের অসামান্যতায় হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। মজার মোড়কে পরিবেশিত সাহানা দত্তের কাহিনীর রহস্য তার গাম্ভীর্য তো হারায়নি, বরং হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও সজীব। যেরকম তিনি দুটি গল্পকে মিশিয়ে ব্যোমকেশ সিরিজ তৈরি করেছিলেন, তেমনি সায়ন্তন ঘোষাল এখানেও দুটি গল্পকে একটি কাহিনীর মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আবার গোরাকে প্রশাসন যদিও ধারাবাহিক খুন বিশেষজ্ঞ বলে অভিহিত করেছে, কিন্তু অন্যান্য অপরাধ সম্বন্ধেও গোরা সমান ওয়াকিবহাল। একারণে সে যদিও লেখকদের রহস্যময় খুনের তদন্তে সিরিয়াল কিলার ধরতে পুলিশকে সাহায্য করতে তৈরি, কিন্তু যখন এক গৃহবধূ তার স্লিপওয়াকিং নিয়ে এক অস্বাভাবিক ঘটনার উত্থাপন করে, সমস্যাটা তার কৌতুহল উদ্রেক করে। তবে এই কেসে সে অকুস্থলে যাওয়ার তাগিদ দেখায় না কিন্তু সমাধানের উপায় বাতলে দেয়। রহস্যে ভরা পরিবেশকে আরো চিত্তাকর্ষক করেছে অয়ন ভট্টাচার্য ও বিনীত রঞ্জন মৈত্রর ধ্বনির ও সুরের জমকালো ভারসাম্য। গোরার খামখেয়ালের সাথে তাল রেখে একাধারে তার বন্ধু, সহকারি আবার হবু ভগ্নীপতির চরিত্রে সুহোত্র মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। বহুদিন বাদে গোয়েন্দা চরিত্রটির সাথে সমান তালে পাল্লা দেওয়া এক শাগরেদ চরিত্র পেলাম যে বন্ধুর পিছনে লাগা আর দরকার বা অদরকারে পাশে থাকতে সমান উৎসাহী। ঈশা সাহার চরিত্রটিতে চমকের একটা নতুনত্ব আছে তবে অভিনয়তে বিশেষ কিছু করার নেই। তবে পরবর্তী সিজনে যে তিনি বেশি কিছু করার সুযোগ পাবেন তার ইঙ্গিত যেমন আছে তেমনি সেখানে ঋত্বিকের পাশে দাপটের সাথে যে তিনি অভিনয় করবেন, তারও যথেষ্ট আভাস আছে।

তাই সময় নষ্ট না করে গায়কিতে ক্যাকোফনিক্স, দেমাকে পোয়ারো, রূপে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাগলা জগাই আর খামখেয়ালে একদম নিজস্ব, ভুলোমনা গোরার সিরিজটি দেখুন ও কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান বিচিত্র কিছু রহস্যের খাসমহলে!

Monday, June 21, 2021

একেনবাবু একমেবাদ্বিতীয়ম!

গল্পের বইয়ের মধ্যে গোয়েন্দা কাহিনী ছোটোবেলা থেকেই আমার খুব প্রিয়। গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রগুলোকে খুব একটা ভুলে যাই না! এমনও হয় যে বহুদিন আগে পড়ার দরুন নামটা ভুলে গেছি, কিন্তু তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট মনে আছে। নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যাব কিন্তু গল্পের গোয়েন্দাদের নয়। কেন যে ইতিহাসের জায়গায় গোয়েন্দা কাহিনী পড়ায় না, এমনিই প্রশ্নমালা পুরো মুখস্থ হয়ে যেত! তখন ব্যাপারটার মধ্যে আতঙ্কের থেকে রোমাঞ্চের পরিমান বেশি হত। মোদ্দা কথাটা হল, গোয়েন্দা কাহিনীমাত্রই আমার মাথার মধ্যে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি দেখায়। এইজন্য যখন খুব ছোটো থাকতে সুজন দাশগুপ্তের গোয়েন্দা একেনবাবু আনন্দমেলার পাতায় আত্মপ্রকাশ করলো, তখন থেকেই আমি আলাদা কিছু বৈশিষ্টসম্পন্ন এই গোয়েন্দাকে চিনি। পরে বড়দের জন্য লেখা এনার কিছু গল্পও পড়েছি। তাই হইচই যখন একেনবাবুকে নিয়ে ওয়েব সিরিজ চালু করল তখন অনেক বাঙালি গোয়েন্দাভক্ত এক আপাতদৃষ্ট নতুন বাঙালি গোয়েন্দার নাম শুনে চমক পেলেও আমার কাছে চমকটা ছিল অনির্বাণ চক্রবর্তীর যিনি এই একেনবাবু চরিত্রটিতে অভিনয় করছেন।
স্বাভাবিকভাবে অনির্বাণ নামটির প্রতি আমার একটি পক্ষপাতমূলক দুর্বলতা আছে (কারন জিজ্ঞেস করলে আবার পাণ্ডব গোয়েন্দা থেকে পড়াশুনা শুরু করতে বলব)! ব্যাপারটা আরো ঘোরালো লাগছিল কারন একেনবাবু পড়তে পড়তে মনের মধ্যে এক মাঝারি উচ্চতার ছিপছিপে চেহারা ধারনা করে নিয়েছিলাম। তা অনির্বাণ চক্রবর্তী উচ্চতায় মাঝারী হলেও গড়নে ছিপছিপে বললে বেশিরকমের বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে, এরকম গোলগাল বাঙালি গোয়েন্দা ছোটো বা রুপোলী পর্দায় আগে দেখা গেছে কি না সন্দেহ! তাই চিন্তাই লাগছিল রে তোপসে! ভদ্রলোক না ঝুলিয়ে দেন সমস্তটা! কিন্তু না, সমস্ত চিন্তাভাবনার অবসান ঘটিয়ে অনির্বাণবাবু সসম্মানে উত্তীর্ণ তো বটেই, সঠিকভাবে দেখলে বলা ভালো যে চরিত্রটি ওনার হাত ধরে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে স্থায়ী জায়গা করে নিল। সেই সমান আমুদে, সমান গায়ে পড়া, অত্যধিক মিশুক, অসামান্য পর্যবেক্ষণক্ষমতাসম্পন্ন, বিশ্লেষণি মনের অধিকারী, রসিক, অত্যধিক কৌতুহলি, বিনয়ের বিরক্তিকর অবতার। বদল অবশ্য হয়েছে, তবে সেটা সময় ও জায়গার। বইয়ের একেনবাবু গোয়েন্দা হিসেবে আমাদের কাছে দেখা দিয়েছিলেন বাঙলা তথা ভারতের বাইরে - মার্কিন মুলুকে আর ইনিও বাঙলার বাইরে থেকে শুরু করলেন তবে ব্যাঙ্গালোরে। নামটা জানি ব্যাঙ্গালুরু বলা উচিত ছিল, কিন্তু পুরনো নামটাই বেশি শ্রুতিমধুর লাগে আর একেনবাবু নিজে যেখানে দৃঢ়তার সাথে একের পর এক ভুলভাল প্রবাদ বলে চলেন, সেখানে এরকম অল্পবিস্তর ভুলত্রুটি চলতে পারে মনে হয়, মানে যেখানে বক্তব্যটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে। তবে দর্শকরা চিন্তা করবেন না। শুরুটা ব্যাঙ্গালোর হলেও কোনোটাতে উনি ঢাকায় আবার কোনোটাতে খোদ বাঙলায়।
সিরিজটির আপাতত চারটে মুক্তিপ্রাপ্ত গল্পের মধ্যে রহস্যের হাতছানি প্রধান হলেও সেটাকে এক হাসির মোড়কে উপস্থাপনা করাটাই একে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। গোয়েন্দা চরিত্রটি নিজেই যেখানে তার চালচলনে কৌতুক উদ্রেক করে সেখানে খানিকটা অন্যরকম তো হবেই। এ যেন অনেকটা জটায়ুর মোড়কে ফেলুদা। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই মাথার ভিতরে কি চলছে। এনার চোখে যেমন নতুন দেখা সবকিছুই স্বাভাবিক বিস্ময় উৎপাদন করে কিন্তু অস্বাভাবিক কোনোকিছু নগন্য হলেও, সহজেই ধরা পড়ে। নিজের চেহারা আর স্বভাবের স্বাভাবিক কৌতুকের আড়ালে তাই ইনি হয়ে ওঠেন এক ধুরন্ধর প্রতিপক্ষ, যাকে এড়ানো মুশকিল। চরিত্রটা শুনতে মজাদার হলেও আমার ধারনা অভিনয়টা কঠিন, আর এখানেই অনির্বাণবাবুর বৈশিষ্ট্য ধরতে পারা যাবে! ঠাট্টার মোড়কে নিজেকে উপস্থাপন করেও চরিত্রটার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেননি। সেইজন্য হাজার বিরক্তি হাজির করেও তিনি হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয়, বুদ্ধিদীপ্ত, শান্তশিষ্ট, বিপদে অবিচল, স্ত্রীয়ের নাম শুনলে বিচলিত, খাদ্যরসিক, আদ্যন্ত বাঙালি এক হাসিখুশী গোয়েন্দা। ধারাবাহিকটির পুরো কৃতিত্ব একজনকে দিলেই হবে না, পরিচালকরাও তার সমান কৃতিত্বের অধিকারী। যেখানে বহু পরিচালক মিলে একটি ধারাবাহিক এগিয়ে নিয়ে যান, সেখানে পর্বের মধ্যে চরিত্র ও পরিবেশনার সামঞ্জস্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানেও মিলিতভাবে সফল সুরজিত চ্যাটার্জি, অনির্বাণ মল্লিক, জয়দীপ মুখার্জী, অনুপম হাড়ি ও অভিজিত চৌধুরী। ধারাবাহিক সিরিজটি যত এগিয়েছে গল্পগুলো যেন তত পরিণত হয়েছে। এটাও খুব একটা দেখা যায় না কারন ধারাবাহিক অনেকদিন ধরে চললে একঘেয়ে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে আর পরেরদিকের পর্বগুলো কম আকর্ষণীয় হয়ে যায়। মাঝখানে কিছু মাসের বিরতি নিয়ে তৈরী বলেই হয়তো সিরিজটি মনোযোগ দিয়ে বানানো হয়েছে তার মানের দিকে নজর রেখে। চিত্রনাট্য ও সংলাপও পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, শমিতা দাশ ও সুজন দাশগুপ্তের লেখনীতে মজবুত হয়ে উঠেছে যার জন্য পরেরদিকের পর্বগুলো আরো জমাটি হয়ে উঠেছে। তবে একটা ব্যাপারে দর্শকদের খেয়াল রাখতে হবে খানিক! সেটা হল আকর্ষণীয় হওয়ার সাথে সাথে গল্পগুলোর বিষয়বস্তু কিছুটা প্রাপ্তবয়স্কদের হয়ে গেছে। সেইজন্য ছোটোদের সাথে দেখলে একটু বুঝেশুনে দেখা দরকার।
বিভিন্ন কাহিনীতে একেনবাবু সঙ্গে পেয়েছেন সঙ্গীসাথি যাদের মধ্যে বাপ্পাদিত্য ওরফে বাপীবাবু অন্যতম। একেনবাবু ব্যাঙ্গালোরের হোটেল থেকে উৎখাত হওয়ার পর দায়িত্ববান নিপাট ভালোমানুষ, বাপীবাবু তাদের দুজনের পরিচিত বন্ধুর অনুরোধে একেনবাবুকে নিজের বাড়িতেই থাকতে দেয়। হাসিমুখে অন্যের আপদে বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানো, চাকরীসুত্রে ভিনরাজ্যের অধিবাসী বাঙালি এই চরিত্রটিতে সৌম ব্যানার্জীকে দারুন মানিয়েছে। উলটো দিকে কারনে অকারনে মাথা গরম করে ফেলা বাপীদের আবাসনের বন্ধু প্রমথর চরিত্রে দেবপ্রিয় বাগচী সঠিক নির্বাচন। এরকম কিছু সঙ্গীসাথী একেনবাবুর জুটে যায় রহস্যের সমাধানে বেরিয়ে। বন্ধুবান্ধব অবশ্য প্রতিবার সাথে থাকতে পারে না, কিন্তু আত্মীয় পরিজন কেউ ঠিক জায়গাটা নিয়ে নেয়। এরকম একটি রহস্যে সাথী হিসেবে পান নিজেরই এক সম্পর্কের বোনকে। অনুরাধা মুখার্জী অভিনীত চরিত্রটি তার বন্ধুর বাড়িতে থাকাকালীন এক রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। সেখানে একেনবাবু যেচে অতিথি হয়ে আসেন আর তারপর জটিল এক খুনের কিনারা করতে এগিয়ে যান।
রহস্যে ভরা পর্বগুলো কখনও একঘেয়ে লাগেনা বিষয়ের নতুনত্বে আর হাসির আবহে। সামনে আসা সমস্যা যতই গুরুতর হয়ে উঠুক না কেন, তার সমাধান ঠাট্টার আড়ালে করে একেনবাবু হয়ে উঠেছেন সবার থেকে আলাদা।