একটা সিরিজ দেখলাম বটে!
প্রলয় মুভিটা দেখেছিলাম, মন্দ নয়। মশলা ছিল, তবে চলে যায়। পলিটিকাল নেতাদের অসামাজিক বাঁদরামোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে এক সাধারণ মানুষ, আর তার পাশে এক সৎ নির্ভীক পুলিশ অফিসার, অনিমেষ দত্ত। সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে গল্পটার শেষটাও সত্যি হলে খুশিই হতো অধিকাংশ মানুষ। যাইহোক, সিনেমাটা যথেষ্ট ঠিকঠাক ছিল।
তো এরপর এই মুভিটার উপর ভিত্তি করে এল আবার প্রলয় সিরিজ।
পুরো ফোকাস এবার অনিমেষ দত্তের উপর। স্পেশাল ব্রাঞ্চের দাপুটে এই অফিসার বেয়াদবী দেখলেই একেবারে নিজস্ব ট্রিটমেন্ট দিয়ে অপরাধীদের শায়েস্তা করেন। প্রথম সিজনেই বোঝা গেল যে এবার পুরোপুরি ঝাড়পিটের ব্যাপার হতে যাচ্ছে। তো তাই সই, মাথার উপর কম চাপ দিয়ে যদি টিভির পর্দায় একটু বজ্জাতদের ক্যালানো দেখতে পাওয়া যায়, ক্ষতি কি! তো দেখলাম এবং সত্যি বলতে কি, উপভোগই করলাম। মশলাটা এবার আরেকটু বেশি, তবে এবারও হজম হবে।
একরকম স্বাভাবিক তাগিদেই তাই দ্বিতীয় সিজনটাও দেখতে বসেছিলাম।
দেখেও ফেললাম।
তবে এবারেই বোধহয় ভুলটা করলাম!
খুব আশা করেছিলাম যে আমাদের জেনারেশনের একটা মিঠুনদা পেতে চলেছি। পেয়েও বোধহয় যেতাম! গুছিয়ে যেরকম ঝাড়পিট চলছিল। মানে, অনিমেষ দত্ত ওরফে শাশ্বত চ্যাটার্জি যেরকম গুণ্ডা দেখলেই রে রে করে রজনীকান্ত স্টাইলে অ্যাকশন দেখাচ্ছিলেন আর যা ডায়ালগ ঝাড়ছিলেন, তাতে মিঠুনদাই বোধহয় বাঙলা ছায়াছবি জগতে একমাত্র তুলনীয়। তবে ওই যে বলে না, অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে, তেমনি একদিকে যেরকম অনিমেষ দত্তের ঝড়ে গুণ্ডারা কুপোকাত হচ্ছিল, সিনেমাটা হচ্ছিল অতিরিক্ত 'সাধুভাষা' প্রয়োগের জন্য। মানে এই সিরিজটা দেখার পর এই ধারণাটা হওয়াই স্বাভাবিক যে ভিলেন হলে তো গাছতলা লেভেলের ভাষা বলবেই, উপরন্তু যত করিৎকর্মা পুলিশ অফিসার হবে, ততো তার মুখের ভাষাও 'সুমধুর' থেকে অতি 'সুমধুর' হওয়াটা দরকার হবে। যাই হোক, এই অনর্গল ও অকারণ ডায়ালগের একঘেয়েমি যেমন ধারাবাহিকটার একটা গোলমাল, এইটার প্রতি বোধহয় অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে, বাকি ব্যাপারগুলোর একটু বেশিমাত্রায় সরলীকরণ ঘটেছে।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মশলার আধিক্য তো আছেই - এমনকি কম যাতে না লাগে, তাই বোধহয় সানরাইজ গুঁড়ো মশলাটাও ব্যবহৃত হয়েছে - কিন্তু তার সাথেও গোলমালও প্রচুর। দেখে তো ভয় হচ্ছে যে যেভাবে গয়নার দোকান লুঠকে প্রায় খেলনার দোকান লুঠের পর্যায় নামিয়ে দেখানো হয়েছে, কেউ না এসব ঘটনায় আবার অনুপ্রানিত হয়ে র্যাণ্ডম গয়নার দোকানে হামলা চালায়। সাথে আছে জেলের ভিতর ও বাইরেটা। এ যেন একেবারে ছ্যাঁচড়াদের স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র - ভিতরে পুলিশ আসামীকে তদ্বির করছে - আর বাইরে - বাইরে পুলিশ কোথায়? দাগী আসামীকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মিডিয়া নেই, লোকজন নেই, সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একটা অতিরিক্ত পুলিশ পর্যন্ত নেই! কেন ভাই? যে যুগে জনতা পিঠ চুলকলে পর্যন্ত হোয়্যাটসঅ্যাপ হয়ে যায়, সেখানে সাংঘাতিক আসামীকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হলে কি সমস্ত সার্ভার একসাথে ক্র্যাশ করে? তখন যেন সকলে ভি আর এস নিয়ে বাড়ীতে আই পি এল দেখছে! আর সিরিজ অনুযায়ী ভিলেনরা সামলাচ্ছে টেকনোলজি, সাথে পুলিস সামলাচ্ছে জেলের ভিতরের পার্টি! এই না হলে মশলা, গুঁড়ো করারও দরকার নেই, একেবারে গোটা গোটা ছেড়ে দিয়েছে রান্নায় এবার। তাই স্বাদটাও হয়েছে তথৈবচ।
তাই অনিমেষ দত্ত, থুড়ি শাশ্বত চ্যাটার্জ্জীর চাপটাও এবার বেশি হয়েছে। পর্দার ওদিকের গুণ্ডা ও পর্দার এদিকের দর্শক, দুজনকেই সামলাতে হয়েছে। বলতেই হবে যে এই ভদ্রলোক হলেন এই সিজনটা পুরো সহ্য করার একমাত্র মোটিভেশন। অবশ্য সাথে আরো দুজন আছেন, খরাজ মুখার্জী ও সোহিনী সেনগুপ্ত, কিন্তু দুজনেই পুরোটাতে নেই বলে উল্লেখ করলাম না, তবে এই দুজনে কিন্তু প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, রোল স্বল্পদৈর্ঘ যাই হোক, অভিনয়গুণে অল্পক্ষণের দৃশ্যও কিন্তু অতিমাত্রায় উপভোগ্য করে দেওয়া যায়। সাথে বরং বলব যে পরিচালক (রাজ চক্রবর্তী) গল্পতে যদি সোহিনী সেনগুপ্ত অভিনীত চরিত্রটিকে আরেকটু জায়গা দিতেন সামনে আসার, তাহলে বোধহয় অন্যরকম কিছু হতে পারত।
অতএব, এর পরেও যদি কোনো সিজন আসে, আমি আবার দেখতে বসব বোমার ঘায়েতেও প্রায় কিছু না হওয়া অনিমেষ 'শাশ্বত' দত্তকে কিন্তু সাথে আরেকটু কম তেজোদীপ্ত ডায়ালগ আর আরেকটু বেশি ঠাসবুনট প্লট থাকলে বোধহয় পুরোপুরি ব্যাপারটাকে উপভোগ করতে পারব।
