Monday, June 28, 2021

পাপ.....কার?

কালিমালিপ্ত ইতিহাসের কিছু অন্ধকার পাতা নিয়ে গল্পের শুরু। চৌধুরীদের বাড়িতে দিনগুলো হওয়ার কথা ছিল আনন্দের। চারিদিকে উৎসবের মেজাজ লোকজনের মধ্যে। শারদ প্রভাতের স্নিগ্ধ পরিবেশে মায়ের আগমন হয়েছে। বাড়ির বড় ও মেজ ছেলেদের পুরো পরিবার বিদেশ থেকে আসছে প্রতিবারের মতো। বাকি ছেলেমেয়েরা কলকাতা থেকে আসবে। এতদিনকার পুরনো পুজো সম্প্রচার করতে টিভি চ্যানেল থেকে একটি দল এসে থাকছে। প্রতিবেশীদের আসা-যাওয়াও তার সাথে চলছে। মানে সব মিলিয়ে এক জমজমাট ব্যাপার বাড়িতে।

কিন্তু তখনই ঘটল এক অঘটন। বাড়ির বহুদিনকার ঠাকুরমশাই হলেন খুন। মুখের মধ্যে পাওয়া গেল এক চিরকুট, তাতে লেখা,  ‘সূচিপত্র’। এক অমঙ্গলের আশঙ্কা দানা বেধে উঠল চৌধুরীদের বাড়িতে। এরমধ্যে সেখানে উপস্থিত এক অনাহুত অতিথি। পুরনো আশ্রিতা, পরে বিতাড়িতা,  তারপর হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের নর্তকী, পার্বণী ওরফে রুবিনা। সে হঠাৎ ফিরে এলো কি জন্যে? সে জানায় তার কাছে কি একটা সম্পত্তি আছে চৌধুরী পরিবারের। কিন্তু সে বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যই তাকে বিশ্বাস করে না। কেউ বিচলিত হয়ে পড়ে তো কেউ ভীত, আবার কেউ বিরক্ত। স্পষ্টতই চক্ষুশূল এই মেয়েটিকে কিন্তু বাড়িছাড়া করতে পারে না কেউ কারণ নিয়ম অনুযায়ী চৌধুরীদের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় কেউ এসে পড়লে তাকে থাকতে দিতে হবে। এদিকে ঠাকুরমশাইয়ের খুনের তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত দারোগা মনোজিত হালদার হানা দেয় চৌধুরীদের বাড়িতে। এর মধ্যেই ঘটে যায় দ্বিতীয় খুন। বাড়ির চতুর্থ সন্তান, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার রুগি, ছোট ছেলে, ছোটনকে মৃত  অবস্থায় পাওয়া যায় বাড়ির পিছনের পুকুড়পাড়ে। আবার মুখে কাগজ। তবে এবার লেখাটা অন্য। মনোজিত হালদারের কথায় কেউ যেন খুনের উপন্যাস লিখছে। বাড়ির সদস্যদের গ্রামের মধ্যেই নজরবন্দী করে পুলিশ। কিন্তু খুনগুলো করল কে? কার এই প্রতিহিংসা? কেন?

জবাব পেতে দেখে নিতে হবে পাপ। টানটান উত্তেজনায় ভরা ধারাবাহিকটি দেখার জন্য হইচই খুলতে হবে। কিছু ঘটনার গণ্ডগোল চোখে পড়লেও মোটের উপর ধারাবাহিকটি চলে যাবে। দুর্গাপুজোটা বাদ দিলে বোধহয় সুবিধে হত কারণ বাড়িতে অপঘাত ঘটে গেলে কি করে পুজো চালানোর মানসিকতাটা থাকে, আন্দাজ করা বেশ মুশকিলের। এরকম ছোটোখাটো ত্রুটি দর্শক যদি মার্জনা করতে পারে তাহলে ধারাবাহিকটি খারাপ লাগবে না। ভীষনভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ধারাবাহিকটিতে মনোজিত দারোগার চরিত্রে রাহুল ব্যানার্জী অনবদ্য। নিঃসন্দেহে ধারাবাহিকটির সেরা অভিনেতার স্থানটি দখল করবেন। রহস্যে ঘেরা দমবন্ধ পরিবেশে রাহুলের প্রবেশ দর্শকদের যেন খানিকটা স্বস্তি দেয়। নরমে গরমে কখনও সে মজার, কখনও নির্মম। অতীত ঘটনার দৃশ্যে কিশোরচরিত্রগুলিতে যারা অভিনয় করেছে, সবাই চরিত্রগুলির বিশেষত্ব ফুটিয়ে তুলতে সবদিক দিয়ে সফল। মানসিক রুগি, সহজে বিচলিত হয়ে ওঠা ছোটনের চরিত্রে সাহেব ভট্টাচার্য ত্রুটিহীন। অনুপম হাড়ি, জয়দীপ মুখার্জীর পরিচালনায় গতিময় এই সিরিজটি পরের দিকে একটু বেশি তাড়াহুড়ো করলেও কাহিনী মূল বিষয় থেকে সরে যায়নি কখনও। সিরিজটি ২০১৯ সালে শুরু করলেও সমাপ্ত হলো ২০২১ সালে। অপেক্ষাটা কিন্তু একটু বেশি হয়ে গেল! তবে প্রত্যাশাটা সেই তুলনায় খুব বাড়িয়ে না রাখাটাই বাঞ্ছনীয়। অতীত, বর্তমানের মধ্যে আলোকচিত্রের তারতম্য, অন্দরমহল, বাইরের দৃশ্যপটের চিত্রগ্রহণের ভারসাম্য রাখার কাজে প্রসেনজিৎ চৌধুরীর অবদান স্বীকার করতেই হবে। প্রসেনজিৎবাবু যেমন পুরনো দিনের স্মৃতি দেখাতে সাদাকালো দৃশ্যের অনাবশ্যক রীতি না মেনেও দৃশ্যের কাল বোঝাতে সফল তেমনি আলোর দক্ষ ব্যবহার করেছেন রহস্যে ঘেরা কিছু পরিবেশ তৈরী করতে। রোমাঞ্চকর, বাহুল্যবর্জিত, গতিময় এই সিরিজটি সেরা না হলেও সমসাময়িক, সমগোত্রীয় ধারাবাহিকগুলোর তুলনায় খানিকটা আলাদা।

No comments:

Post a Comment